


সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, রানাঘাট: গত বিধানসভা ভোটের আগেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি— নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। ফলস্বরূপ দেদার ভোটও পেয়েছিল গেরুয়া শিবির। লোকসভা ভোটের আগেও সেই বুলি বদলায়নি। পদ্ম-নেতাদের ফের বিশ্বাস করেছিল মানুষ। বিধায়ক ও সাংসদ দুই-ই বিজেপির। তারপর চূর্ণী ও ইছামতী দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে। প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। উলটে এই বিধানসভার বহু মানুষের নাম বাদ গিয়েছে এসআইআরে। গুচ্ছ গুচ্ছ কাগজ হাতে শুধুই ছুটে বেড়াচ্ছেন তাঁরা। এবারের ভোটে বিজেপির সমস্ত মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর হেনস্তার বদলা নিতে কার্যত শপথ নিয়েছেন মামজোয়ানের দলুইগ্রাম, জয়নারায়ণপুর, জগন্নাথপুরের বাসিন্দারা। শুধু মামজোয়ানই নয়, দত্তফুলিয়া, বারহাট্টা, হাঁসখালি, যুগলকিশোর অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় গণক্ষোভের আঁচে রীতিমতো প্রমাদ গুনছে বিজেপি।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা রানাঘাট উত্তর-পূর্ব আসনে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশের বেশি ভোটার মতুয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। বঙ্গে পরিবর্তনের আবহে ২০১১ সাল থেকে পর পর দু’বার ঘাসফুল ফুটেছিল এই কেন্দ্রে। কিন্তু নিঃশর্ত নাগরিকত্ব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২১ সালে বাজিমাত করে বিজেপি। এবারে এসআইআরের আবহে বিজেপির সেই প্রতিশ্রুতির ফানুস চুপসে গিয়েছে। সূত্রের খবর, খসড়া, চূড়ান্ত এবং সাপ্লিমেন্টারি তালিকা মিলিয়ে রানাঘাট উত্তর-পূর্ব বিধানসভায় ৪৩ হাজার ১১৪ জন ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। তা নিয়ে আম জনতার মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েই এবারের নির্বাচনে হারানো জমি পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে ঝাঁপিয়েছে তৃণমূল।
রানাঘাট উত্তর-পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রটির মধ্যে রয়েছে রানাঘাট-২ ও হাঁসখালি ব্লকের ১১টি গ্রাম পঞ্চায়েত। ২০১১ সালে এই কেন্দ্রে তৃণমূল পেয়েছিল ৯৩,৮৩৬ ভোট। ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে তাদের ভোট কমেছিল মাত্র ৬২১টি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিপিএম প্রার্থীর সঙ্গে ব্যবধান ছিল প্রায় ১৫ হাজার। কিন্তু ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে ছবিটা বদলে যায়। এই বিধানসভায় প্রায় ৪৩ হাজার ভোটে বিজেপির কাছে পিছিয়ে যায় তৃণমূল। ২০২১ সালে বিজেপির অসীম বিশ্বাস পেয়েছিলেন ১ লক্ষ ১৬ হাজার ৭৮৬ ভোট। জয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ৩২ হাজার।
এই ব্যবধান কমিয়ে জয় আসবে কীভাবে? এখানেই মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছে ঘাসফুল শিবির। ২০২১ সালে রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বর্ণালী দে রায়। জেলা পরিষদের এই সদস্য এবার রানাঘাট উত্তর-পূর্ব কেন্দ্র থেকে প্রার্থী। বিধানসভার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারও চালাচ্ছেন। বর্ণালী বললেন, ‘সমস্ত এলাকায় হেঁটে হেঁটে প্রচার করছি। মানুষের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছি। তাঁদের সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনছি। মহিলারা বেরিয়ে এসে মিছিলে পা মেলাচ্ছেন। ’
বিজেপির একাংশের অভিযোগ, অন্তর্দ্বন্দ্ব সামাল দিতেই এই কেন্দ্রের কোনো বাসিন্দাকে প্রার্থী করতে পারেনি শাসকদল। পাশের কেন্দ্র থেকে প্রার্থী আনতে হয়েছে। যদিও বিজেপির দাবিকে পাত্তা দিচ্ছেন না বর্ণালী। তাঁর সাফ কথা, ‘বিজেপি প্রার্থীর মতো আমিও রানাঘাট ২ ব্লকের বাসিন্দা। জেলা পরিষদেরও সদস্য। দীর্ঘদিন ধরেই এই সমস্ত এলাকার বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। তাই বহিরাগত দাবি আসলে বিজেপির রাজনীতিহীনতার পরিচয়।’
বিদায়ী বিধায়ক অসীম বিশ্বাসকে এই কেন্দ্রে আবারও প্রার্থী করেছে গেরুয়া শিবির। তিনি এক সময় কামালপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ছিলেন। গোটা এলাকা হাতের তালুর মতো চেনেন। অসীমবাবু জানালেন, বিভিন্ন পঞ্চায়েতে ক্ষমতায় থাকলেও প্রতিশ্রুতিমতো উন্নয়ন করতে ব্যর্থ তৃণমূল। শাসকদলের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন সময়ে নানান দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। মানুষ ভোটে এসবের জবাব দেবে। যদিও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের মতে, এই কেন্দ্রে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে নাজেহাল বিজেপি। অসীমবাবুকে নিয়েও দলে ক্ষোভ রয়েছে। ভোটবাক্সে অবশ্য তার প্রভাব পড়বে না বলেই দাবি বিজেপির।
এবারের নির্বাচনে ভোট বাড়ানোর ব্যাপারে আশাবাদী সিপিএম প্রার্থী মৃণাল বিশ্বাসও। তিনি বলেন, ‘প্রচারে সাড়া থেকেই স্পষ্ট, বামেদের ভোট এবারে ঘরে ফিরবে। মানুষ তৃতীয় বিকল্প হিসাবে আমাদের বেছে নেবেন।’ বাস্তব চিত্র অবশ্য বলছে অন্য কথা। এখনও জেতার জায়গায় নেই সিপিএম। এসআইআর কাঁটায় রীতিমতো চাপে বিজেপিও। এতদিনের হয়রানির জবাব যে মানুষে ভোটে দিতে মুখিয়ে রয়েছে, তা বিলক্ষণ বুঝছেন পদ্মনেতৃত্ব। স্পষ্ট হচ্ছে দেওয়াল লিখন!