


শ্রীকান্ত পড়্যা, কাঁথি: কাঁথি দক্ষিণ আসনে ফের অরূপকুমার দাস বিজেপির প্রার্থী। তিনি জেলা রাজনীতিতে ‘দাদা’র অনুগামী বলে পরিচিত। তাঁর নাম ঘোষণা হতেই আদি-নব্য সংঘাত জোরালো হচ্ছে। ক্ষোভে ফুঁসছেন আদিরা। সেই ক্ষোভ প্রশমনে হিমশিম অবস্থা বিজেপি নেতৃত্বের। সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ময়দানে ঝাঁপিয়েছে তৃণমূল।
কাঁথি দক্ষিণ থেকে ২০২১ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন অরূপ। পাশাপাশি তিনি জেলা সভাপতিও ছিলেন। কিন্তু, তিনি একটি লবির বাইরে বেরতে পারেননি বলে আদি শিবিরের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ। বিধায়ক হিসেবেও তাঁকে সেভাবে এলাকার মানুষজনও পাননি। তাই এবার প্রথম থেকেই প্রার্থী বদলের দাবি উঠেছিল বিজেপির অন্দরে। নেতৃত্বকে চাপে রাখতে কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলার সুশীল দাসের সমর্থনে বিভিন্ন জায়গায় হোর্ডিংও পড়ে গিয়েছিল। সুশীলবাবু আদি নেতা বলে পরিচিত। একদা বিজেপির মণ্ডল, জেলা কমিটির পদে ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দিকে পাল্লা ভারী ছিল। দলের একটা বড় অংশের আবেগও সুশীলবাবুর ঝুলিতে ছিল। কিন্তু, সেসব অগ্রাহ্য করেই বিদায়ী বিধায়ককে ফের প্রার্থী করে বিজেপি নেতৃত্ব। আদি নেতাদের অনেকেই এমন সিদ্ধান্তে চটে লাল। কেউ কেউ বলছেন, ‘স্থানীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের আবেগ অনুভূতিকে গুরুত্ব না দিলে খেসারত তো পেতেই হবে।’
কন্টাই টাউন রাখালচন্দ্র বিদ্যাপীঠের শিক্ষক তথা বিজেপি নেতা ও কাঁথির বাসিন্দা রামকৃষ্ণ দাস বলেন, ‘২০২১ সালে অরূপবাবু একজন বিশিষ্ট শিক্ষক পরিচয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। খুব সহজে জয়ী হন। কিন্তু, গত পাঁচ বছরে আমরা অরূপবাবুকে একটি লবির বিধায়ক ও নেতা হিসেবে পেয়েছি। আমরা মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম এবার প্রার্থী বদল হোক। বাস্তবে সেটা হল না। আমার ধারণা, এজন্য দলকে মূল্য চোকাতে হবে।’ কাঁথির বাসিন্দা তথা ইছাবাড়ি হাইস্কুলের শিক্ষক তুহিন ভুঁইয়া বিজেপির প্রাক্তন জেলা কমিটির সদস্য। নব্যদের দাপটে এখন দলে কোণঠাসা। তিনি আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, ‘অরূপবাবু ব্যক্তি হিসেবে ভালো মানুষ। আগে রাজনীতি করেননি। ২০২১ সালে দলে যোগ দিয়ে প্রার্থী হন এবং বিধায়ক হন। তিনি সকলকে নিয়ে চলতে পারেননি। তাই এবার সর্বজনগ্রাহ্য কাউকে প্রার্থী চেয়েছিলাম আমরা। শেষমেশ আমাদের ইচ্ছেকে গ্রাহ্য করেনি দল।’
ভোট ঘোষণার অনেক আগে থেকেই সুশীলবাবুকে সামনে রেখে বিজেপির একটা বড় অংশ ২০২৬ সালের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্যাম্পেন শুরু করে দিয়েছিল। বড় বড় হোর্ডিং, ফ্লেক্সও টাঙানো হয়েছিল। সুযোগ পাননি সুশীলবাবু। স্বাভাবিকভাবে তিনি নিজেও বেশ হতাশ। বুধবার তিনি বলছিলেন, ‘অনেক কর্মী চেয়েছিলেন, প্রার্থী নতুন কেউ হোক। কিন্তু, সেটা হল না!’
এদিকে, গেরুয়ায় ক্রমেই মোহভঙ্গ কাঁথিবাসীর। সাংসদ ও বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও সেভাবে উন্নয়ন হয়নি বলে সাধারণ মানুষজনের দাবি। বুধবার তখন সকাল ১০টা। কাঁথি সেন্ট্রাল বাসস্ট্যান্ডে চায়ের ঠেকে ভোটের তুফান। জালালখাঁবাড়ের কালীপদ রায়, কিশোরনগরের শেখ দুকা সহ আরও অনেকে সেই ঠেকের সরব কণ্ঠ। কালীপদ এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে বলছিলেন, ‘বলতে দ্বিধা নেই ভাই, বিজেপির জনপ্রতিনিধিরা জনবিচ্ছিন্ন! যখনই ওঁরা কোথাও যান, তখনই আধা সেনারা ঘিরে থাকেন। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, মাছিও গলতে পারে না। অথচ, এই কাঁথিতে সুধীর গিরির মতো মাটির মানুষকে সাংসদ হিসেবে দেখেছি। সবার জন্য অবারিত দ্বার ছিল তাঁর।’
এসব চাওয়া-পাওয়াকে অবশ্য গুরুত্ব দিতে নারাজ বিজেপি। দলের জেলা সভাপতি সোমনাথ রায় জোরের সঙ্গে বললেন, ‘দক্ষিণ কাঁথিতে প্রার্থী নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। অরূপবাবু এবারও বিপুল মার্জিনে জয়ী হবেন।’ কাঁথি দক্ষিণের তৃণমূল প্রার্থী তরুণ জানার পাল্টা, ‘আমরা এবার কাঁথি দক্ষিণ আসন পুনরুদ্ধারের জন্য ঐক্যবদ্ধ। মানুষও বলছেন, এবার তাঁরা আর ভুল করতে চান না।’