Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

যুবসাথীর লাইনে নিখোঁজ বিজেপি, উধাও বাম

দুটো লাইন পাশপাশি হাঁটছে। সেই বকখালি থেকে বালুরঘাট, পাহাড় থেকে জঙ্গলমহলে। কোন লাইনটা আপনার মতো সাধারণ মানুষের কাছে স্বস্তির, কাঁধে হাত রেখে আস্থা জোগানোর?

যুবসাথীর লাইনে নিখোঁজ বিজেপি, উধাও বাম
  • ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: দুটো লাইন পাশপাশি হাঁটছে। সেই বকখালি থেকে বালুরঘাট, পাহাড় থেকে জঙ্গলমহলে। কোন লাইনটা আপনার মতো সাধারণ মানুষের কাছে স্বস্তির, কাঁধে হাত রেখে আস্থা জোগানোর? এসআইআর না যুবসাথী? একটায় যুবক-যুবতিদের সমাজের মূলস্রোতে সংযুক্তির হাতছানি, অন্যটায় বিয়োজনের খাঁড়া, আগাগোড়া বাংলা বিরোধী চক্রান্তের বারুদে ঠাসা! এসআইআরের লাইন হতাশার, হেনস্তার, ভোটারদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলার। গত সাড়ে তিন মাস উঠতে বসতে শুধু নির্বাচন কমিশনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কুনাট্য মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে এই বঙ্গে। সৌজন্যে গেরুয়া শক্তির বঙ্গ দখলের নেশা। মোদিরাজ্য গুজরাতে ইতিমধ্যেই এসআইআর শেষ হলেও বাংলায় এখনো শেষ হয়নি ভোটার বিতাড়নের সাতকাহন। আগামী শনিবার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের কথা। যদিও শেষ পর্বে এসেও আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন রাজ্যের মহামান্য সিইও সাহেব। কাজ নাকি ঢের বাকি। পিছোতে পারে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ। যদিও সুপ্রিম কোর্ট কমিশনের একচ্ছত্র ক্ষমতা খর্ব করে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি তালিকা প্রকাশ করতেই হবে। প্রয়োজনে সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট বের করা যেতে পারে। এই চূড়ান্ত পর্বে কমিশনের কাজকর্ম খতিয়ে দেখবেন কলকাতা হাইকোর্ট নিযুক্ত জুডিশিয়াল অফিসাররা। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের উপরই নির্ভর করছে ভোটের দফা ও দিনক্ষণ, কেন্দ্রীয় বাহিনীর খতিয়ান। স্বভাবতই ফাইনাল লিস্ট বেরলেই চক্রান্তের ক্লাইম্যাক্স দেখব আমরা। কত রোহিঙ্গা বাদ গেল আর কত উচ্চবর্ণ হিন্দুর অধিকারে কোপ! গেরুয়া শাসনে মতুয়া থেকে রাজবংশী সমাজ কতটা অবহেলিত, তার দুধ কা দুধ পানি কা পানি হয়ে যাবে!

Advertisement

গত এক দশক ধরেই সর্বাধিক কেন্দ্রীয় বাহিনী নামিয়ে কখনো সাত, কখনো আট দফায় ভোট হয়েছে এই বঙ্গে। ভাবটা এমন চোর-জোচ্চর, ছিঁচকে সমাজবিরোধী, বোম বাঁধা মস্তান থেকে কট্টর সন্ত্রাসবাদী যেন শুধু এরাজ্যেই থাকে। কমিশনের এই একচোখামি কেন? বিগত লোকসভা ভোটে এরাজ্যে ভোট হয়েছে সাত দফায়, দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯২ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে। বাকি সাড়ে সাত পোয়া দেশে যেন ‘শ্মশানের শান্তি’, সেই কারণেই বাহিনী লাগে কম। চব্বিশের ভোটে পাকিস্তানি উগ্রপন্থীদের ডেরা কাশ্মীরে মোতায়েন ছিল ৬৩ হাজার আর নকশাল অধ্যুষিত ছত্তিশগড়ে মাত্র ৩৬ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনী। এরই বিপরীতে বঙ্গে ভূস্বর্গের চেয়ে দেড়গুণ বাহিনী মোতায়েন করেও ভরাডুবি হয়েছে বিজেপির। একে ৪৭’র গুলিবর্ষণের মধ্যেও কাশ্মীরে ভোট হয়েছে পাঁচ পর্বে, বাংলায় সাত দফায়! কোন বিচারে? চব্বিশে বিশ্বের সবচেয়ে ‘যশস্বী’ প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর তুলনায় সামান্য কম জনপ্রিয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলা ঘুরে গিয়েছেন সবমিলিয়ে ষাট বারেরও বেশি। তার উপর দামাল দলবদলুর এলোমেলো গোল্লাছুট উত্তর থেকে দক্ষিণে। তবু লোকসভায় আসন কমেছে। সেই কারণেই এবার দফা কমিয়ে ভোটার বাদের কৌশল নিয়েছে দীনদয়াল উপাধ্যায়ের শিষ্যরা। বিজেপি চায় এক দেড় কোটিরও বেশি নাম বাদ দিয়ে, লাল তিলক কাটাদের নেতৃত্বে বাংলা দখল করতে। সেই কারণেই চাপে পড়ে বারবার স্ক্রুটিনি করতে বাধ্য হচ্ছে কমিশন। বিজেপির তৈরি করে দেওয়া ওই তালিকা বেরলে মানুষের ক্ষোভ তো আছড়ে পড়বেই। গণ্ডগোলের আগাম আশঙ্কায় আগেভাগেই কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এবারও দেওয়াল লিখন কিন্তু পড়তে পারছে ভিনরাজ্য থেকে আসা প্রভারী, প্রমুখ, মণ্ডল কর্তা সহ কতশত পদাধিকারী। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে বাঙালি বুঝেছে, এই দলটার কাছ থেকে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, পানের পিক আর মনীষীদের নাম বদলের উদ্ভট নাটক ছাড়া কিছুই পাওয়ার নেই। বঙ্কিমদা, স্বামী রামকৃষ্ণ আর রবীন্দ্রনাথ সান্যালদের ফাঁকে গেরুয়া পাঁক মেখে নিজস্বতা বিসর্জন দিতে কি রাজি হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি? ভেটকি, ইলিশ, পুকুরের রুই কাতলা খাওয়া ছাড়ার ফতোয়া সইতে পারবে তো মাছেভাতে বাঙালি!
পুতুল নির্বাচন কমিশনকে সামনে রেখে একটা চূড়ান্ত নেগেটিভ কর্মসূচির মধ্যেই খোলা হাওয়ার মতো যুবসাথীর আবেদন জমা দেওয়ার ভিড় আশা সঞ্চার করেছে। অন্তত পাঁচ বছর যুবক যুবতিরা হতাশা দূরে ঠেলে বুক ভর্তি অক্সিজেন নিয়ে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে পারবেন। একুশের ভোটে বাংলার মা বোনেদের ক্ষমতায়নের নয়া অধ্যায় রচিত হয়েছিল মমতারই সৌজন্যে। এবার যুবক যুবতিদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লড়াইতে শামিল হয়েছে মা মাটি মানুষের সরকার। যুবসমাজ খুঁজে নিচ্ছে তাঁর আপনজনকে। এই লাইনে বহু জায়গাতেই বিজেপি ও সিপিএমের যুব ফ্রন্টের সদস্যদেরও দেখা যাচ্ছে ফর্ম তুলতে। ঠিক লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো। প্রমাণ হচ্ছে, তৃণমূল পাশে দাঁড়ায়, সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও আপনাকে যুক্ত করার চেষ্টা করে সমাজের মূলস্রোতে। বিজেপি বিভাজন করে, হিন্দু মুসলমান বিভেদের বিষ ছড়িয়ে মধুভাণ্ডের ভাগ নেওয়ার ছক কষেন নেতারা। দেশের মধ্যে একমাত্র বাংলায় একশো দিনের টাকা আটকে মজা লোটেন। আর সিপিএম ফেন্সের উপর বসে বাইনারি কেটে শূন্যের কলঙ্ক কবে ঘুচবে হিসাব কষছে। এই আবর্তে কোন শক্তিকে বেছে নেবে বাঙালি নিজের সংস্কৃতি, নিজের ঐতিহ্য ও অস্মিতাকে নিয়ে সসম্মানে মাথা উঁচু করে বাঁচতে? বিজেপি টের পাচ্ছে, এবারও মোদিজির বাংলা দখল শুধু অসম্ভবই নয়, না মুমকিন। 
মূর্খ বিরোধীদের হিসাব ছিল যুবসাথীর লাইনটা বুঝি গ্রামবাংলার ফিচার হয়েই থেকে যাবে। কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো এক্ষেত্রেও ভুল হল। কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহারই শুধু নয়, শহর কলকাতার অভিজাত বসতি মায় যাদবপুর, টালিগঞ্জ পেরিয়ে ভবানীপুর, শ্যামবাজার, টালা, বরানগর, গঙ্গার দু’পারে হাওড়া থেকে হালিশহর—কোথাও তো ছোটো লাইন দেখলাম না। শিক্ষিত উচ্চশিক্ষিত এমনকি পেশাদার কোর্স পাশ করা যুবক যুবতিরাও যেভাবে সকাল থেকে বিকেল হাজার হাজার সহযোদ্ধার পিছনে দাঁড়াচ্ছেন, তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে বেকারদের চাকরি দিতে কেন্দ্রের মোদি সরকারের চরম ব্যর্থতা কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। এই লাইনে সম্পন্ন ঘর থেকে গ্রামের আটচালা সবাই শামিল। জানুয়ারি মাসেই দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে গিয়েছে। সংসদে মোদি সরকার তা স্বীকার করতে বাধ্যও হয়েছে। আর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এআই আর স্টার্টআপের গোলকধাঁধায় এক অদ্ভুত সুপারফিসিয়াল বড়োলোকের ভারতবর্ষকে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। দিল্লিতে মোদির এআই সামিট দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, মাথায় চুল নেই বগলে বাবরি! মমতা ওই চোরা পথে না হেঁটে বাস্তবের সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছেন আমাদের। লক্ষ লক্ষ পরিবারকে বাঁচার অবলম্বন উপহার দিচ্ছেন। এর চেয়ে বড়ো আর কী হতে পারে।
দিনের পর দিন দলে লাঞ্ছনা অপমান সইতে সইতে কোণঠাসা সিপিএম ত্যাগী প্রতীক উররা বিলক্ষণ জানেন আজ সিপিএম ভাতাবিরোধী সাজলেও বামফ্রন্টের আমলেই বেকার ভাতার যাত্রা শুরু হয়েছিল। বলা হতো ক্যাডার ভাতা। কমরেড না হলে জুটত না। তখন দামি গাড়ি চেপে আসা বিলিতি কমিউনিস্ট আর ধুলো মেখে আসা মুড়িছোলা চিবানো কমরেডদের মধ্যে যোজন পার্থক্য ছিল। শ্রেণি বৈষম্য সেদিনও ছিল। আজও দামি ক্রিম আর পারফিউম মাখা বাইশ লাখি গাড়ি চাপা সিউডো বুদ্ধিজীবীরাই দলের নীতি নিয়ন্ত্রক মধ্যমণি। চিরদিনই দলটা শ্রেণিচ্যুত। যে তরুণ ব্রিগেডের স্বপ্ন ফেরি করে শূন্যের হতাশা কাটানোর চেষ্টা করছিল, ভোট আসতেই তথাকথিত বিপ্লবীয়ানায় যবনিকা। যুবরাই নেতাদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে পালাচ্ছেন, মানুষের কী হবে! যদি আবারও শূন্যতেই থামতে হয় তাহলে দলের ৬২ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো সংকটের মুখে পড়তে হবে সিপিএমকে। সংখ্যালঘু ভোটের সঙ্গে ছলনা করতে গিয়ে হিন্দু ভোটের বাকিটাও চলে গেলে, জাতও যাবে পেটও ভরবে না। কোনো মহান সেলিম, সাম্প্রদায়িক হালিম উদ্ধার করতে পারবে না।
বর্তমান রাজ্য সরকারকে যতই ভাতার সরকার এবং সাধারণ মানুষকে ভাতাজীবী বলে বিজেপি ও সিপিএম কটাক্ষ করুক, এবারও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাস্টার স্ট্রোকে কাজ হতে শুরু করছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সঙ্গে যুবসাথী। এই জোড়াফলাতেই আপাতত বিরোধীদের আক্কেলগুড়ুম! ভয় পেয়ে জয় শ্রীরাম নামক পাটকেল ছেড়ে অমিত শাহ হরে কৃষ্ণে মজেছেন। যদি হিন্দুদের মন পাওয়া যায়। কিন্তু পাওয়া কি যাচ্ছে? ওই হরে কৃষ্ণ নাম উচ্চারণে কোথাও প্রেম নেই, সহানুভূতি নেই, বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার নেই। শুধুই লোক ভোলানো টোপ। কথা শেষ হলেই ফিরতি বিমান ধরে দিল্লি পাড়ি দেওয়ার  ব্যস্ততা। শমীকবাবুরা কাঁপাকাঁপা গলায় যতই পালাবদলের ছড়া আওড়ান, এই বাংলা কিন্তু মনস্থির করে ফেলেছ আরও পাঁচ বছরের জন্য সে মমতার নেতৃত্বকেই স্বীকার করে নেবে। ভেদাভেদ শান্তিপ্রিয় বাঙালির দু’চক্ষের বিষ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ