


সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: বিধ্বংসী গেরুয়া ঝড়ে পশ্চিম বর্ধমান জেলায় প্রায় নিশ্চিহ্ন তৃণমূল। রাজ্যের শাসকদল হয়েও কেন একটি আসনেও জয় পেল না? কি এমন স্ট্র্যাটেজিতে কিস্তিমাত করল সাংগঠনিক শক্তিহীন বিজেপি। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই। ভোটযুদ্ধ শেষে ধীরে ধীরে রণকৌশল প্রকাশ্যে আনছেন বিজেপি নেতারা। সেই রণকৌশল বেশ শিক্ষণীয়। সংগঠন না থাকলেও যে ভোটে জেতা যায়, তা অন্তত প্রমাণ করে দিয়েছেন বিজেপির থিংক ট্যাঙ্করা।
কি সেই রণকৌশল? বিজেপি নেতারা ঘরোয়া আলোচনায় জানিয়েছেন, বিগত পাঁচ মাস ধরে জেলাবাসীর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখেছিলেন দলের কার্যকর্তারা। সেই কাজ অত্যন্ত গোপনে ও নীরবে করা হয়। ক্ষমতায় থেকেও তৃণমূল তার আঁচই পায়নি। দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে থাকা পুলিশ, গোয়েন্দারাও ধরতে পারেননি জেলায় পদ্মচাষের কৌশল। এমনকী, তৃণমূলের কর্পোরেট ভোট কুশলী সংস্থা আইপ্যাকের সদস্যরাও ঘুণাক্ষরে টের পাননি। সবাইকে অন্ধকারে রেখে জেলার প্রায় প্রতিটি ঘরের হেঁশেলে ঢুকে পড়েছিলেন বিজেপি নেতারা। শুধু পশ্চিম বর্ধমান জেলা নয়, রাজ্যজুড়েই এমন নিবিড় জনসংযোগ কর্মসূচি চালিয়েছিল বিজেপি। প্রতি জেলাতেই লক্ষ লক্ষ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল তারা। যার সুফল মিলেছে ইভিএমে।
বিজেপির বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গিয়েছে, এই কর্মসূচি শুরু হয়েছিল এসআইআর পর্ব শুরুর সময় থেকে। কোনওরকম পতাকা না নিয়ে প্রতি এলাকায় দু’জন কর্মী বাড়ি বাড়ি যেতে শুরু করেন। সুখ-দুঃখের গল্প নিয়ে কথাবার্তা শুরু হতো। তারপরই পরিবারের মানসিকতা বোঝার চেষ্টা হতো। শেষে পরিবারের এক সদস্যের ফোন নম্বর সংগ্রহ করা হতো এই সব তথ্য ‘ডোর টু ডোর’ অ্যাপ সংক্ষেপে ডি টু ডি অ্যাপে আপলোড করা হতো। জেলা পার্টি অফিস থেকে সেই তথ্য বিজেপির নিজস্ব পোর্টাল ওয়েস্ট বেঙ্গল ইলেকশন ২০২৬-এ আপলোড করা হতো। শুরুতে কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। বহু বুথে বিজেপির সক্রিয় কর্মী ছিল না। তবু হাল ছাড়েননি নেতারা। অন্য বুথ থেকে কর্মীদের পাঠানো হয়েছে। বহু বাসিন্দা বাড়িতে গেলে বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু, অপমান, লাঞ্ছণা সহ্য করেও নেতারা তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করে গিয়েছেন।
এতো গেল তথ্য সংগ্রহের কাজ। ওইসব পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য তিনটি কলসেন্টার এক যোগে কাজ করেছে। তিনটি কলসেন্টার গড়া হয়েছিল কলকাতা, শিলিগুড়ি ও আসানসোলে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁরা মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। রাখঢাক না করে বিজেপির আসানসোল সাংগঠনিক জেলার সভাপতি দেবতনু ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা জেলার ২ লক্ষ ৭০ হাজার পরিবারের সঙ্গে পাঁচ মাস ধরে যোগাযোগ রেখেছিলাম নীরবে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলেই আমরা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম, সবক’টি আসনে আমরা জিতছি।’
একুশের নির্বাচনে বিজেপির প্রচারে অনেক বেশি আড়ম্বর ছিল। ভিন রাজ্যের নেতারাও ঘুরতেন রাজার হালে, ঢাক ঢোল পিটিয়ে। এবার মোদি, অমিত শাহর প্রচার ছাড়া প্রচার কৌশল ছিল একেবারে অনাড়ম্বর। বদলে, মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখাতেই জোর দিয়েছিল। পাশাপাশি, সংঘের কর্মী সহ সহানুভূতিশীলরাও মাঠে-ময়দানে, চায়ের আড্ডায়, বাসে-ট্রেনে সমানে ভোটারদের মনজয়ের কাজ করে গিয়েছেন। তৃণমূলের জেলা সভাপতি নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী অবশ্য বলেন, ‘মানুষ আমাদেরকেই ভোট দিয়েছেন। বিজেপি কমিশনের মাধ্যমে সেই ভোট লুট করেছে।’