


২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে শরিকদের কাঁধে ভর করে কোনোরকমে সরকার গঠন করতে পারলেও একক দল হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি বিজেপি। তার পরের প্রায় দু’ বছরের শাসনে দেশে-বিদেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাবমূর্তি ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাজকর্ম নিয়ে যে বিস্তর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে—তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই প্রেক্ষিতে পরের লোকসভা ভোটে (২০২৯-এ) জয় সুনিশ্চিত করতে এবং বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলি দখল করতে এখন তড়িঘড়ি এক ঢিলে দুই পাখি মারার বিপজ্জনক খেলায় মেতে উঠেছে মোদি বাহিনী। খবরে প্রকাশ, সদ্য সংসদের অধিবেশন শেষ হলেও আগামী ১৬-১৮ এপ্রিল তিন দিনের জন্য বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছে। সেখানে মহিলা সংরক্ষণ আইনের বিশেষ সংশোধনী বিল পাশ করার চেষ্টা হবে, যাতে ২০২৯-এর লোকসভা ভোটের আগে তা কার্যকর করা যায়। পাশাপাশি, লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যের লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস করতে সংবিধান সংশোধনের ব্যবস্থাও প্রায় পাকা করে ফেলা হয়েছে। তড়িঘড়ি এই দুই সংশোধনী আনার পরিকল্পনা করে কেন্দ্রের শাসকগোষ্ঠী বোঝাতে চাইছে, এতে দেশ ও প্রতিটি রাজ্যেরই মঙ্গল হবে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদিদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তিসঙ্গত একগুচ্ছ প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা।
সংসদে মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) আসন সংরক্ষণ আইন হয়েছে ২০২৩ সালে। তারপর প্রায় তিন বছর ঘুমিয়ে কাটালেও এখন এই আইন কার্যকর করতে উঠেপড়ে লেগেছে মোদি সরকার। উদ্দেশ্য হল, পশ্চিমবঙ্গ (২৩ ও ২৯ এপ্রিল) এবং তামিলনাড়ু (২৩ এপ্রিল)-তে ভোটের আগে মহিলাদের ক্ষমতায়নের বার্তা দেওয়া। ঘটনা হল, ভোটের রাজ্যগুলিতে প্রচারে গিয়ে একথা বলছেন বিজেপি নেতারা। কিন্তু নির্বাচনি আচরণবিধি চালু থাকার মধ্যেই সংসদে এই সংশোধনী বিল আনা যায় কি না— সেই প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধীদের মতে, ’২৩ সালে পাশ হওয়া আইন ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে কার্যকর করতে পারত শাসকগোষ্ঠী। এখন যে ২০২৯-এর ভোটে সংরক্ষণের কারণ দেখানো হচ্ছে, তার জন্যও হাতে আরও তিন বছর সময় রয়েছে। কিন্তু ঠিক এই সময়টা বেছে নেওয়া হয়েছে, রীতিমতো অঙ্ক কষেই। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর মতো একাধিক সামাজিক প্রকল্পের সুফল পেয়ে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটারদের একটা বড়ো অংশ সেই ২০২১-এর নির্বাচন থেকেই মমতার ‘ভোট ব্যাংক’ বলে পরিচিত। এখন বাংলার ভোটের মুখে মহিলা সংরক্ষণের গাজর ঝুলিয়ে ফায়দা তোলার চেষ্টা করছেন নরেন্দ্র মোদিরা। প্রশ্ন উঠেছে, বিজেপি কি আসলেই মহিলাদের ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী? তথ্য বলছে, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে বিজেপির প্রার্থী তালিকায় মহিলা ছিলেন মাত্র ৬৯ জন। এঁদের মধ্যে জয়ী হয়েছেন মাত্র ৩১ জন (১৩ শতাংশ)। কেন্দ্রে মোট ৭২ জন মন্ত্রীর মধ্যে মহিলার সংখ্যা মাত্র ৭ জন। অন্যদিকে, লোকসভায় তৃণমূলের জয়ী মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা ১১ জন (৩৮ শতাংশ)।
এই মহিলা সংরক্ষণ সংশোধনীকে সামনে রেখেই লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস করে ফেলতে চাইছে মোদি সরকার। সাধারণ নিয়মে, জনসংখ্যা বাড়লে লোকসভায় আসন বাড়ে। বর্তমান লোকসভায় যে ৫৪৩টি আসন রয়েছে তা ঠিক হয়েছিল ১৯৭১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে। মাঝে ২০০১ সালে সংবিধান সংশোধন করে আরও ২৫ বছরের জন্য আসন সংখ্যা একই রাখা হয়। সেই হিসাবে ১ এপ্রিল শুরু হওয়া জনগণনার শেষেই আসন পুনর্বিন্যাস হওয়ার কথা। কিন্তু এসবের তোয়াক্কা না করে ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে এখন আসন বাড়াতে চাইছে গেরুয়া শিবির? সেই হিসাবে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বেড়ে হবে ৮১৬টি। অর্থাৎ ২৭৩টি আসন বাড়বে। নিজেদের ‘নিরপেক্ষ’ প্রমাণ করতে প্রতিটি রাজ্যের লোকসভা আসন ৫০ শতাংশ বাড়বে বলে জানিয়েছে কেন্দ্র। বার্তা দেওয়া হচ্ছে, প্রতিটি রাজ্যকে সমান দৃষ্টিতে দেখা হবে। কিন্তু চালাকিটা এখানেই। এই ফরমুলা মানলে তামিলনাড়ুর আসন ৩৯ থেকে বেড়ে ৫৯, কেরলের আসন ২০ থেকে বেড়ে ৩০টি হবে। সব মিলিয়ে দক্ষিণ ভারতের সব রাজ্য মিলিয়ে আসন বাড়বে ৬৬টি। কিন্তু উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির আসন বাড়বে অন্তত ২০০টি। এর মূল কারণ, অত্যন্ত সফলভাবে দক্ষিণের রাজ্যগুলি জন্মনিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা কার্যকর করায় সেসব রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম। এই একই কারণে কাশ্মীর, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি, হিমাচল প্রদেশের মতো রাজ্যগুলিরও তুলনামূলক প্রতিনিধিত্ব কমে যাবে। অথচ জনবিস্ফোরণের কারণে উত্তর ভারতের হিন্দি বলয়, যা বিজেপির গড় বলে পরিচিত—সেখানে আসন বাড়বে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। যেমন, লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের (৪২টি) সঙ্গে এখন উত্তরপ্রদেশের (৮০টি) আসন সংখ্যার পার্থক্য ৩৮টি। ৫০ শতাংশ আসন বৃদ্ধির ফরমুলা মানলে বাংলার আসন বেড়ে হবে ৬৩টি, উত্তরপ্রদেশের ১২০টি। অর্থাৎ পার্থক্য বেড়ে দাঁড়াবে ৫৭টি। ফলে এই ফরমুলায় আসন বাড়লে আসলে লাভ কার? তা পরিষ্কার, বিজেপির। মোদির দল এই অঙ্কেই আগামীর রাস্তা পরিষ্কার রাখতে চাইছে। তাই অশনি সংকেত দেখছে বিরোধীরা।