


সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: বিজেপির প্রথম সারির নেতারা এতদিন ধরে বলে আসছিলেন, সংখ্যালঘু ভোট তাঁদের প্রয়োজন নেই। ভোটের দ্বারপ্রান্তে এসে কী এমন ঘটল যে, সেই ভোট পেতে আদাজল খেয়ে নামতে হল বাংলায়! রীতিমতো বিহার ও উত্তরপ্রদেশ থেকে সংখ্যালঘু সেলের কার্যকতাদের এনে বঙ্গের মুসলিম সমাজের মন গলাতে মরিয়া মোদি-অমিত-নীতিন নবীনরা। এমনটাই বিজেপি সূত্রে খবর। অবশ্য সর্বস্তরের মুসলিমদের কাছে ঘেঁষতে পারবে না জেনে টার্গেট ঠিক করা হয়েছে দু’টি শ্রেণিকে—এক, অন্যান্য দলের বিক্ষুব্ধ মুসলিম নেতাদের। দুই, মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের। এই দুই শ্রেণির মগজ ধোলাইয়ের দায়িত্ব পড়েছে বহিরাগত মুসলিম কার্যকর্তাদের উপর। ইতিমধ্যেই প্রতিটি জেলায় একাধিক দলে ভাগ করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁদের। বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলির উপর।
সেই মতো উত্তরবঙ্গের দুই দিনাজপুর, কোচবিহারের মতো জেলায় সংখ্যালঘু নেতারা কাজ শুরু করে দিয়েছেন। কে কত সংখ্যক বাংলার মুসলিম ভোট দলের অনুকূলে টানতে পারবেন, তার উপর নির্ভর করছে তাঁদের পদোন্নতি। পাশাপাশি, বিশেষ পুরষ্কার দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে বলে বিজেপি সূত্রের খবর। বিজেপির এমন রণকৌশল অবশ্য এই প্রথম নয়। লোকসভা ভোটে মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমানে পরীক্ষামূলকভাবে তারা এই কৌশল নিয়েছিল। কিন্তু সফল হয়নি। এবার পরিস্থিতি আরও ঘোরাল। এসআইআরে বাতিল হওয়া ভোটারদের সিংহভাগই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদেরকে নানাভাবে হয়রানি করিয়ে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। আর এর নেপথ্যে যে বিজেপি কলকাঠি নেড়েছে, তা আর বুঝতে বাকি নেই সংখ্যালঘু সমাজের। ফলে, তাঁরা এখন এককাট্টা গেরুয়া বিরোধী হিসেবে বাংলার ভোট ময়দানে নয়া সমীকরণ তৈরি করছে। সেই সমীকরণ ভাঙতে না পারলে সমুহ বিপদ। সেটা টের পেয়েই বাংলার ভোট ময়দানে দলের সংখ্যালঘু নেতাদের নামিয়েছে বিজেপি। এমনটাই মত রাজনীতির কারবারিদের। বিজেপি সূত্রে খবর, বঙ্গে আগত বিজেপির ওই সংখ্যালঘু নেতারা সুসংহত পদ্ধতিতে মগজ ধোলাইয়ের কাজ শুরু করেছেন। প্রথমে তাঁরা স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে অন্যান্য দলের বিক্ষুব্ধ মুসলিম নেতাদের একটা তালিকা তৈরি করছেন। সেই মতো তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ছলে-কৌশলে বিজেপির উপর রোষ হালকা করার চেষ্টা করছেন। প্রয়োজনে নানা অফারও দেওয়া হচ্ছে। একটু মন গললেই তাঁদের নিয়ে বিভিন্ন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রামে যাচ্ছেন। একটি বাড়িতে পাড়ার লোকদের নিয়ে ছোট ছোট বৈঠক করছেন। বিজেপিকে সমর্থন করলে ভাল হতে পারে বলেও তাঁরা বোঝাচ্ছেন। দ্বিতীয় টার্গেট মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের একটা অংশ। তাঁদের কাছে গিয়ে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির গুণকীর্তন করা হচ্ছে। ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলে ধরা হচ্ছে উন্নয়নের ছবি। পাশাপাশি টোপ দেওয়া হচ্ছে নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদানের। বিজেপি নেতা মৃত্যুজ্ঞয় চন্দ্র বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী সব সময় বলেন, সব কা সাথ সব কা বিকাশ। তৃণমূল জমানায় সংখ্যালঘুদের উন্নয়ন কিছু হয়নি। ওদের শুধু ভোটের কাজে লাগানো হয়েছে।’ খণ্ডঘোষের সিপিএম প্রার্থী রামজীবন রায় বলেন, ‘বিজেপি বিভাজনের রাজনীতি করে। ওদের মানুষ পছন্দ করে না।’ তৃণমূলের সংখ্যালঘু সেলের সভাপতি মহম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে ভোট চাওয়ার ওদের কোনও অধিকারই নেই। আজ কেন প্রয়োজন পড়ল। ওদের নেতারা তো প্রায়ই বলে বেড়ান সংখ্যালঘু ভোট ছাড়াই জিতবেন। এবার জিতে দেখাক। তবে, এটা বলতে পারি, সংখ্যালঘু এলাকায় গেলে ওরা তাড়া খাবে। অপমানের জবাব দিতে সবাই মুখিয়ে রয়েছেন।’