


পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: বীরভূম জেলাজুড়ে অবৈধ বালি পাচারের রমরমা করবার চলছে বলে অভিযোগ। ময়ূরাক্ষী, অজয় থেকে শুরু করে ব্রহ্মাণী, সিদ্ধেশ্বরী- জেলার নদীগুলি এখন কার্যত বালি-চক্রের একচেটিয়া চারণভূমি। অভিযোগ, পুলিশ, পরিবহণ এবং ভূমিদপ্তরের একাংশের মদতেই প্রতিদিন শয়ে শয়ে বালি বোঝাই ট্রাক পাচার হয়ে যাচ্ছে অন্যত্র। অথচ জেলার বাসিন্দাদেরই বালি কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। বালির দাম কমানোর দাবি নিয়ে মঙ্গলবার জেলাশাসকের কাছে ডেপুটেশনও জমা দিয়েছে বিজেপি। প্রশাসনের এক পদস্থ কর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
সিউড়ি, সাঁইথিয়া মহম্মদবাজার, রাজনগর থেকে শুরু করে নানুর, ইলামবাজার, রামপুরহাট, ময়ূরেশ্বর, কিংবা নলহাটি- সর্বত্রই বালির এই অবৈধ কারবার এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। বিরোধীদের আঙুল সরাসরি প্রশাসনের মধ্যে থাকা এক সিন্ডিকেটের দিকে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পুলিশ-প্রশাসনেরই কয়েকজন পদস্থ কর্তা এবং শাসক দলের কিছু নেতা। তাঁরাই এই গোটা পাচার-কাণ্ডের সুতো নাড়ছেন বলে অভিযোগ। বালি মাফিয়াদের এই ‘নিঃশব্দ লুঠ’-এর মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। জেলাবাসীর অভিযোগ, বীরভূমের বালি বাইরে পাচার করে একদল আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও, জেলার বাসিন্দাদেরই বালি কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। বছর খানেক আগেও যে বালি দেড়-দুই হাজারে মিলত, আজ তার দাম দ্বিগুণ। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে মঙ্গলবার জেলাশাসকের দপ্তরে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের দাবি, বীরভূমের বালি আগে জেলার মানুষের চাহিদা মেটাবে, তারপর তা ভিনজেলায় যাবে। সেইসঙ্গে, আবাস যোজনার গরিব উপভোক্তাদের জন্য প্রতি ট্রাক্টর এক হাজার টাকায় বালির জোগান নিশ্চিত করতে হবে প্রশাসনকে। বিজেপির জেলা সভাপতি উদয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের তোপ, বালির আকাশছোঁয়া দামের কারণে মধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষ ঘর তৈরি করতে পারছেন না। অবিলম্বে এই কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি রুখতে হবে। কেন বীরভূমে বালির এই অগ্নিমূল্য? এর উত্তরে বিস্ফোরক দাবি করছেন জেলার বালি ব্যবসায়ীদের একাংশ। তাদের অভিযোগ, গত বর্ষায় তিলপাড়া ব্যারাজ ভাঙার পর থেকেই বালির বাজার অস্থির হতে শুরু করে। দোসর হয়েছে প্রশাসনের হঠাৎ ‘সক্রিয়তা’। নদী থেকে নৌকায় মেশিন লাগিয়ে বালি তোলার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে প্রশাসন। ব্যবসায়ীদের দাবি, এই কারণেই বালির দাম বেড়েছে।
কিন্তু নৌকায় মেশিন লাগিয়ে বালি উত্তলন তো বরবরই অবৈধ? এক ব্যবসায়ীর জবাব, নৌকায় মেশিন লাগিয়ে বালি তোলা আইনিভাবে অবৈধ হতে পারে, কিন্তু বাজারের বিপুল চাহিদার সঙ্গে জোগানের ভারসাম্য রাখতে ওটাই একমাত্র বিকল্প ছিল। ‘প্রণামী’ দিয়ে এতকাল ওইভাবেই চলে এসেছে। বর্তমানেও নৌকা বন্ধ থাকলেও বালি লুটের এই অবৈধ করবার চলছে। সবচেয়ে বেশি কারচুপি হচ্ছে বৈধ ইজারা নেওয়া কিছু ঘাটে। প্রশাসনের নাকের ডগায় চলা এই বালি-সিন্ডিকেট কবে ভাঙবে, এখন সেই প্রতীক্ষায় জেলাবাসী।
মহম্মদবাজারের একটি বালি ঘাটে চলছে লুট। -নিজস্ব চিত্র