সুখেন্দু পাল, ভাতার: ‘সোনার আলোয় জাগবে পৃথিবী, বাজবে আলোর বাঁশি। আকাশ-পটে মহামায়ার ভুবনমোহিনী হাসি।’ দেবীপক্ষের সূচনাতেই আর্বিভূতা অসুরবিনাশিনী। বাংলার প্রান্তরে ছড়িয়ে রয়েছে মহামায়ার নানা কাহিনী, বিভিন্ন রূপ। যেমন ভাতারের খেরুর গ্রামের মায়ের কথাই ধরা যাক। এই গ্রামের মিশ্রমহল বাড়ির মা সন্ধিপুজোর সময় কেঁপে ওঠেন। সেই কারণে মাকে বেঁধে রাখতে হয়। প্রায় ৪০০ বছর ধরে এই রীতি চলে আসছে। গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, সন্ধিপুজোর সময় মায়ের রূপ বদলে যায়। সেই সময় মায়ের সামনে হাতজোড় করে প্রার্থনা করলে স্বপ্ন পূরণ হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই কেউ মাকে কেউ সোনার অলঙ্কার, মানত করা বস্তু নিবেদন করেন। প্রতিদিনই পুজো হয় নির্ঘণ্ট মেনে। কোনওভাবেই সময়ের হেরফের করা যায় না।
সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত মায়ের ভোগে শোল, চ্যাং মাছের টক চাই-ই চাই। তা পেতে অসুবিধা হয় না। ভোগের আগে তা ঠিক জোগাড় হয়ে যায়। এছাড়া, ভোগে লাগে আনজা শাক। এই রীতিও প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে।
প্রাচীন মন্দিরের পুরোহিত বংশগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, মায়ের আগমনের আশায় বছরভর দিন গুনতে থাকি। নিয়ম মেনে আমরা জৈষ্ঠ্য মাসে কাঠামোতে মাটি দিই। তারপর থেকে ধাপে ধাপে মূর্তি গড়ার কাজ এগিয়ে যেতে থাকে। গ্রামের দিঘি থেকে ঘট ভরে আনা হয়। গ্রামে আরও সাতটি পুজো হয়। সবাই একসঙ্গে ঘট ভরতে যায়। সেই সময় পুরো গ্রাম রাস্তায় নেমে আসে। দিঘির পাড়ে ভিড় উপচে পড়ে। সেখান থেকে ফিরে আসার পরই গ্রামবাসীরা মন্দিরে হাজির হয়ে যান। এতে এক অন্যরকম তৃপ্তি পাওয়া যায়।
গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, মিশ্রমহল বাড়ির পুজো ঘিরে নানা মাহাত্ম্য ছড়িয়ে রয়েছে। মায়ের কাছে এসে অনেকের সমস্যা মিটে গিয়েছে। আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারাও মন্দিরে পুজো দিয়ে যান। যে যার মতো করে মানত করে যান। তা পূরণ হলে পরের বছর সেই মানত শোধ করতে আসেন।
বর্ধমানের ভাতার ব্লক মূলত কৃষির উপরই নির্ভরশীল। প্রাচীন জনপদের বিভিন্ন গ্রামে পুরনো পুজো বহু বছর ধরে হয়ে আসছে। নতুন করে বিভিন্ন গ্রামে বারোয়ারি পুজো শুরু হয়েছে। কিন্তু খেরুর গ্রামের মতো পুজোগুলির প্রতি স্থানীয় বাসিন্দাদের আকর্ষণ এখনও কমেনি। সেই কারণে স্থানীয়রা বোধনের দিন থেকেই প্রাচীন মন্দিরগুলিতে ঢুঁ মারেন। দেবীপক্ষ শুরু হয়ে গিয়েছে। এই গ্রামে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। আর কয়েকটা দিন পরই মন্ত্রোচ্চারণ আর ঢাকের আওয়াজে জনপদের পরিবেশটাই বদলে যাবে। মিশ্রমহল বাড়িতে তখন শুধুই আনন্দ আর আনন্দ।