


সংবাদদাতা, কাটোয়া: রাতে ঘুমের মধ্যে ভাগীরথীর জলের শব্দ কানে আসে। ধীরে ধীরে এগচ্ছে ভাগীরথী। বছর বছর বন্যায় স্থানীয়দের ভিটেমাটি চলে যায়, ভেসে যায় নথিপত্র। ভাগীরথী নথি গিলে খেয়েছে, তাই এসআইআরে অনেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। যার ফলে চূড়ান্ত তালিকায় নাম বাদ গিয়েছে অগ্রদ্বীপের বহু পরিবারের। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী থেকে সেনা জওয়ানের মা— ছাড় পাননি কেউই। ভোটাধিকার হারিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পরিবারগুলি।
কাটোয়া-২ ব্লকের অগ্রদ্বীপ পঞ্চায়েতকে ভাগীরথী দু’ ভাগ করেছে। একটা অংশ পূর্ব বর্ধমান জেলার ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, অন্য অংশটি নদীয়া জেলার ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। অগ্রদ্বীপে ১৮টি বুথ রয়েছে। ভোটার সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। তারমধ্যে ১২৯ জনের নাম বাতিল করেছে কমিশন। অগ্রদ্বীপের ১৮৪, ১৮৫, ১৮৬, ১৮৭, ১৮৮, ১৮৯, ১৯০, ১৯১ নম্বর বুথগুলি নদীর অপর পাড়ে। এই ৮টি বুথে মোট ভোটার ৬ হাজার ৭৮৭ জন। এরমধ্যে বাদ পড়েছেন ৭৮ জন ভোটার। আটটি বুথই ভাঙনপ্রবণ। সেখানে গেলেই ভাগীরথীর ভয়াবহ ভাঙন চোখে পড়বে। অগ্রদ্বীপের প্রায় ১২০০ বর্গ মিটার এলাকা ভাঙন কবলিত। তারমধ্যে ঘোষপাড়ার ১২০ বর্গ মিটার ভয়ানক ভাঙনপ্রবণ।
১৮৪ নম্বর বুথের বাসিন্দা বিজয় ঘোষ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত। তাঁর মা অতসী ঘোষের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ওই বুথেরই বাসিন্দা নমিতা ঘোষের স্বামী অর্জুন ঘোষের নাম বাদ পড়েছে। তাঁদের বড় ছেলে বাপন ঘোষ মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে এলআইসিতে কাজ করেন। তাঁর এবং তাঁর ভাই সুবীর ঘোষের নাম বাদ পড়েছে। সুবীরবাবু বলেন, আমি কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী। সাতবার নির্বাচনের সময় মাইক্রো অবজার্ভারের কাজ করেছি। সমস্ত তথ্য দেখানোর পরেও আমাদের পরিবারের সবার নাম বাদ গেল। বুঝতে পারলাম না বাদ দেওয়ার জন্যই শুনানিতে ডাকা হয়েছিল কি না।
১৮৫ নম্বর বুথের মাঝেরপাড়ার ক্ষুদিরাম ঘোষ কয়েকদিন ধরেই ছোটাছুটি করছেন। তিনি বটতলায় চায়ের দোকান চালান। তাঁর পরিবারের সবার নামই চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ক্ষুদিরামবাবুর স্ত্রী সন্ধ্যা ঘোষ, ছেলে বংশী ঘোষ, নাতি বিশ্বজিৎ ঘোষ, মেয়ে দিপালী ঘোষের নাম বাদ পড়েছে।
ক্ষুদিরামবাবুর দাবি, ২০০২ সালের বন্যায় দু’ বার বাড়ি ভেঙেছে। দু’ বারই আমাদের বাড়ি বদলাতে হয়েছে। সমস্ত নথি দেখিয়েছি। তবুও আমাদের পরিবারের সবার নাম বাদ চলে গিয়েছে।
১৮৪ নম্বর বুথের বাসিন্দা বিমলা বাগ, তাঁর ছেলে শুকদেব বাগ ও সন্ধ্যা মণ্ডল সবার নাম বাদ চলে গিয়েছে। এলাকার তৃণমূল নেতা কেষ্ট বাগ বলেন, এলাকায় বহু মানুষের নাম বাদ দিয়েছে। এখন প্রত্যেকেই আতঙ্কে ভুগছেন। এটা চক্রান্ত ছাড়া কিছুই নয়। আরেক তৃণমূল নেতা বিশ্বনাথ সাহা বলেন, নির্বাচন কমিশন চক্রান্ত করে বাদ দিয়েছে। প্রত্যেকেই জীবিত। অথচ তালিকায় তাঁদের নাম নেই।
অগ্রদ্বীপের বাসিন্দা জহর বাগ বলেন, আমার স্ত্রী, ছেলের সবার নাম বাদ দিয়েছে। আমরা ১৯৯৫ সাল থেকে ভোট দিচ্ছি। ভাঙনে ভিটে হারিয়েছি৷ আর এখন ভোটাধিকার হারালাম। উৎকণ্ঠায় কাটোয়ার অগ্রদ্বীপের বহু পরিবার।-নিজস্ব চিত্র