


বাংলার কুর্সি দখল করতে তবে কি নিজেদের রাজনৈতিক লাইনের উপর পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছে না বিজেপি? ভোটে জিততে মন্দির-মসজিদের নামে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন অথবা অনুপ্রবেশই যে গেরুয়াবাহিনীর সবচেয়ে বড়ো ‘অস্ত্র’, তা সোচ্চারে জানাতে কোনো রাখঢাক করেন না বিজেপি নেতারা। অথচ পশ্চিমবঙ্গের জন্য ‘মোদি গ্যারান্টি’ বা ‘সংকল্পপত্র’ প্রকাশ করে যেসব নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে চেনা ‘অস্ত্রে’ শান দিয়ে বিশেষ লাভ হবে না বুঝেই রাজ্যের ভোটারদের জন্য এবার নানা কিসিমের পসরা সাজিয়েছে বিজেপি। সেখানে রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করা, আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি বেকারের চাকরি, মহিলা ও বেকারদের মাসিক তিন হাজার টাকা ভাতা, সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ, মহিলাদের সুরক্ষায় বিশেষ মহিলা পুলিশ ব্যাটেলিয়ান গঠন, সংবিধানের অষ্টম তফসিলে কুড়মালি ও রাজবংশী ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করা, প্রধানমন্ত্রী কিষান প্রকল্পে টাকা বাড়ানোর মতো ১৫ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সংকল্পপত্রে স্থান পেয়েছে অনুপ্রবেশ সমস্যা এবং তৃণমূল সরকারের দুর্নীতি নিয়ে ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশের অঙ্গীকারও। লোকসভা ও বিধানসভা ভোট এলে রাজনৈতিক দলগুলি ইস্তাহার প্রকাশ করে পরের পাঁচ বছরের জন্য করণীয় কাজের ফিরিস্তি জানিয়ে দেয়—এটাই দস্তুর। কিন্তু বিজেপির প্রতিশ্রুতির কথা শুনলেই যে কারও ‘হীরক রাজার দেশে’র উদয়ন পণ্ডিতের সেই স্মরণীয় উক্তির কথা মনে পড়তে বাধ্য, ‘ওরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে।’
ধরা যাক, বেকারদের চাকরির কথা। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ২০১৪ সালে মোদি বলেছিলেন, বছরে ২ কোটি বেকারকে চাকরি দেবেন। তাহলে বারো বছরে ২৪ কোটি বেকারের চাকরি হওয়ার কথা। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহজ যুক্তি হল, এই হিসাবে দেশের ৪১২৩টি বিধানসভার প্রতিটিতে ৫৮ হাজার বেকারের চাকরি হওয়া উচিত। কিন্তু ৫৮ জনেরও কি চাকরি হয়েছে? বাংলায় কৃষকদের জন্য টাকা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, দেশজুড়ে দাবি উঠলেও কেন কৃষি ফসলের ন্যায্য সহায়ক মূল্য দিচ্ছে না মোদি সরকার? কেন ৭০০ জন কৃষক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন? অনুপ্রবেশ নিয়ে সংকল্পপত্রে কড়া অবস্থানের কথা শোনা গেলেও প্রশ্ন উঠেছে, পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলা, দিল্লি বিস্ফোরণে পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীদের যোগাযোগ থাকার অভিযোগ থাকলেও কেন সীমান্তে তাদের আটকাতে পারেনি কেন্দ্র? বিজেপি প্রায় বারো বছর কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও কেন অনুপ্রবেশ আটকাতে ব্যর্থ হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজ্যের দুর্নীতির ইস্যুতে শ্বেতপত্র নিয়ে প্রশ্ন, বিজেপি শাসিত সরকারের মন্ত্রী বা নেতাদের একাংশের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের কেন তদন্ত হয় না? কেন অন্য দল থেকে যাওয়া দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারা বিজেপিতে যোগ দিলেই সব ধামাচাপা পড়ে যায়? রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সংকল্পপত্রে প্রশ্ন উঠলেও সরকারি রিপোর্টই বলছে, বিজেপি শাসিত ডবল ইঞ্জিনের একাধিক রাজ্যই অপরাধের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। নির্বাচনি ইস্তাহারে সপ্তম বেতন কমিশন লাগু করার কথা বলেছে বিজেপি। এবারের বাজেটেই এই কমিশন গঠনের কথা ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার।
প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘নকল’ করা কি অন্যায়? উত্তর হল, একেবারেই নয়। যা কিছু ভালো, আদর্শ—তা অনুসরণ করার মধ্যে কোনো ভুল নেই। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনা করে চলেছেন তাঁর নাম জওহরলাল নেহরু। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর পরিধানের জ্যাকেট বা কোটটি একসময় দেশে-বিদেশে ‘জওহর কোট’ নামে সমধিক পরিচিত ছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণে সেই কোটই এখন ‘মোদি কোট’ হয়ে গিয়েছে! সুতরাং বিজেপির নকল বা অনুকরণ করার অভ্যাস বা রীতি যে বেশ পুরানো— তা একরকম স্বীকৃত। অনেকটা সেই ট্র্যাডিশন থেকেই বিজেপির সংকল্পপত্রে মমতা সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও যুবশ্রীর ধাঁচে দুটি প্রকল্প রাখা হয়েছে। এই ‘নকল’ নতুন নয়। বিজেপি শাসিত একাধিক রাজ্যেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনুকরণে প্রকল্প চলছে। প্রশ্ন উঠেছে, সেইসব রাজ্যে কি মহিলারা ভাতার টাকা ঠিকমতো পাচ্ছেন? তৃণমূলের দাবি, দিল্লিতে মহিলাদের মাসে ২৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার কথা ঘোষণার ১৪ মাস পরেও কেউ এক টাকাও নাকি পায়নি। আবার এমন রাজ্যও আছে, যেখানে মাঝপথে মহিলাদের ভাতা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বিজেপির নগদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা শুনলেই মোদিজির মুখ মনে পড়তে বাধ্য। কারণ, ২০১৪-তে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা করা হবে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নিয়ে গেরুয়া শিবিরের এমন কীর্তিকলাপ দেখে বলতেই হয়, শুধু ‘নকল’ করলেই হবে? ভালো কাজ হলে তা তো অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু বিজেপির ডিএনএ-তে এই সংকল্প নেই। তাই রাজ্যবাসীকে সতর্ক করে দিয়ে বলা যায়, নকল করে কোনোমতে পাসের চেষ্টা করা গেলেও প্রথম হওয়া যায় না। অতএব নকল হইতে সাবধান।