Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নতুন সরকারের কাছে বাংলার প্রত্যাশা

রাজ্যের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র শুভেন্দু অধিকারী। সাড়ে পাঁচ দশক পর মাতঙ্গিনী হাজরার জেলা থেকে  অজয় মুখোপাধ্যায়ের যোগ্য উত্তরসূরি।

নতুন সরকারের কাছে বাংলার প্রত্যাশা
  • ১০ মে, ২০২৬ ০৬:২৬
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: রাজ্যের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র শুভেন্দু অধিকারী। সাড়ে পাঁচ দশক পর মাতঙ্গিনী হাজরার জেলা থেকে  অজয় মুখোপাধ্যায়ের যোগ্য উত্তরসূরি। তাঁকে অভিনন্দন। নিঃসন্দেহে এই নতুন গেরুয়া সরকারের কাছে রাজ্যের দশ কোটি মানুষের প্রত্যাশার শেষ নেই। সুষ্ঠু শিল্পায়ন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারি চাকরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নই হোক এই সরকারের পাখির চোখ। রাজ্য সরকারি কর্মীরা কেন্দ্রের সমহারে ডিএ পান, ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন গঠিত হোক, সেই আশা পূরণের দিকেই তাকিয়ে সবাই। ঢালাও দেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসুক ডবল ইঞ্জিনের আকর্ষণে। পরিবর্তনের এই বাংলায় পরিযায়ীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফিরুক নিজের মাটিতে, রাজ্যের বাইরে ছড়িয়ে যাওয়া বাঙালি মেধারও প্রত্যাবর্তন হোক ভীমরবে। ‘বাংলা বৃদ্ধাশ্রম’—এই থমকে যাওয়া মানসিক স্থিতির বদল চাই। রাজ্যের ছেলেমেয়েরা এখানেই কাজ করে যেন সন্তুষ্ট থাকতে পারে। একইসঙ্গে শুধু হাতবদল নয়, চিরতরে অবসান হোক তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজের। ‘আমরা উন্নতি করব, এক হব’ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাড়ে সাত দশক আগের এই দৃপ্ত ঘোষণা যেন শুধু কথার কথা হয়ে না থাকে, রাজ্যটার অগ্রগতির সোপান হিসাবেই পথ দেখায়। সমগ্র বাঙালি সমাজের আজ এই একটাই প্রার্থনা, কথা কম কাজ বেশি।

Advertisement

ইতিহাসে যে কোনো পরিবর্তনই সর্বদা স্বাগত। দুঃখ একটাই, ভোটপর্বে প্রাণহানি এড়ানো গেলেও নির্বাচনোত্তর খুনখারাপি ঠেকানো গেল না এবারও। অমিত শাহ কথা দিয়েছিলেন ভোটের ফল বেরনোর পর থেকেই গুন্ডাদের ছুটি। মোদিজি বলেছিলেন, ৫ মে থেকে ‘চুন চুন কে’ হিসাব হবে। সবিনয়ে বলি, ফল জানার পর দেড়শো ঘণ্টা কেটে গেলেও তা হয়নি। প্রথম সপ্তাহে দুষ্কৃতীদের হাতে যে গরিব অসহায় মায়েদের কোলখালি হল তাঁরাও আজ অভয়ার মায়ের মতোই সন্তান হারানো শোকে পাথর, তাঁদেরও বিচার দিতে হবে নতুন সরকারকে। না হলে হানাহানির এই টানাপোড়েনে উধাও হওয়া দূরে থাক আরও চেপে বসবে ভয়ের নিকশ কালো ভূত। দূর জেলা তো বটেই, কলকাতা শহরের বুকেও ফল বেরনো ইস্তক একাধিক পার্টি অফিস দখল, আগুন, খুন দেখে মনে হচ্ছে বদলের গেরুয়া আবির মেখেও কলকাতা আছে আগের কলকাতাতেই। খুনের তালিকায় যেমন আছেন বেলেঘাটায় তৃণমূলের বুথ এজেন্ট বিশ্বজিৎ পট্টনায়েক তেমনি নিউটাউনের বিজেপি কর্মী মধু মণ্ডল। গত বুধবার মধ্যরাতে কলকাতার প্রাণকেন্দ্র থেকে মাত্র কুড়ি কিলোমিটার দূরত্বে অতর্কিতে খুন হলেন বদলের কান্ডারি শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ। মৃত্যুর কোনো তৃণমূল-বিজেপি হয় না, হিন্দু-মুসলমান কট্টর ভাগাভাগিও রাজ্যকে পিছনের দিকেই টানে। যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন সেই সব পরিবারের দুঃখের রং এক। গরিবের বাড়ি চুরমার কিংবা পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সক্ষম সদস্যকে হাতপা ভেঙে ফেলে রাখা, বদলার এই ঝোঁক যদি বাড়তে থাকে তাহলে বাংলা ফের অন্ধকারের দিকেই হাঁটবে। হানাহানি বন্ধ করে রাজ্যটাকে সামনের দিকে এগিয়ে দিন, নতুন সরকারের শপথে রাজ্যবাসীর প্রত্যাশা এটাই। কিন্তু রাজ্যজুড়ে দু’পক্ষের এই মৃত্যুমিছিলই জানান দিচ্ছে বদল যা শুধু তা আপাতত বহিরঙ্গেই। লাল নীল সবুজের বিগত চার দশকের ধারাপাত গেরুয়াতে বদলালেও রাজনৈতিক আকচাআকচির জেরে মৃত্যু স্বজন হারানো পরিবারের কাছে সতত কালো-ধূসরই। স্বজন হারানোদের শোকের আমরা ওরা হয় না! আজকের শপথের পর শুভেন্দুবাবুর প্রথম কাজ  হোক সন্ত্রাস খতম করা। রুটি রুজির সমস্যা সমাধানের সঙ্গে নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা একটাই, ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ যেন স্রেফ বিজ্ঞাপনী স্লোগান না হয়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে সত্যিকারের আস্থার হাতটা রাখে। দলমত রং সম্প্রদায় বিশ্বাস নির্বিশেষে সবাই মাথা উঁচু করে বাঁচুন, সবাইকে নির্ভয়ে বাঁচার সুযোগ করে দিন। তা হলেই শ্যামাপ্রসাদের আদর্শের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে। 
পরিবর্তনের ঢেউয়ে প্রথমবার পদ্ম ফুটেছে বাংলায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নিঃসন্দেহে নরেন্দ্র মোদির দলের প্যান ইন্ডিয়া বিস্তারে বাংলা দখল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। ৪ মে গণনার দুপুর থেকেই কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ অটো-টোটো স্ট্যান্ড, বাস গুমটি, গুরুত্বপূর্ণ বাজার, রেল স্টেশন পদ্ম পতাকায় মোড়া। এর নামই কি আসল বদল! যাঁরা দিন আনে দিন খায় তাঁরাই প্রথম পেট বাঁচাতে রংবদলের শরিক হয়, এটাই পালাবদলের নিয়ম। সেই তাগিদ থেকেই এই সেদিনও তৃণমূলের নীচুতলার পতাকাবাহীরা রাতারাতি গেরুয়া অবিরে রাঙিয়েছেন নিজেদের। বাঙালি মন জয়ে জেলায় জেলায় মাছভাত খাওয়ানোও চলছে জোর কদমে। কিন্তু এর মধ্যেই পক্ষে বিপক্ষে মিলিয়ে প্রায় দশ জনের মৃত্যু নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক। যাঁরা মেরেছেন এবং যাঁরা মরেছেন দু’তরফই কেউ কোনো দলেরই নীতি নির্ধারক নন। মন্ত্রীসান্ত্রিও হবেন না কোনোদিন, এঁদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার সম্ভাবনাও নেই, কিন্তু মার খাচ্ছেন এবং মারছেন তাঁরাই। এখনও রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী রয়েছে। আড়াই লক্ষ আধাসেনা দিয়ে ভোট করানোর পর এত দ্রুত প্রশাসনের রাশ আলগা হওয়ার কথা নয়, তবু রক্তরক্তি সন্ত্রাস থেকে মুক্ত হতে পারল না বাংলার রাজনৈতিক আঙিনা। নিশ্চয়ই শপথ গ্রহণের পর এই হানাহানির অবসান ঘটাতে শেষপর্যন্ত যাবে নতুন সরকার। ভাইয়ে ভাইয়ে সংঘর্ষ বাংলাকে আর যেন পিছনে ঠেলতে না পারে তা দেখাই হবে শুভেন্দুবাবুর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
জীবনে বড়ো হওয়ার পর তিন তিনটে পালাবদল দেখলাম এই বঙ্গে। উনিশশো সাতাত্তর, দু’হাজার এগারো এবং চলতি ছাব্বিশে। ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্টের আমল, বাহাত্তরের সন্ত্রস্ত নির্বাচন, ইন্দিরার জরুরি অবস্থা এসবই আমাদের শৈশব কৈশোরে ঘটে গিয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এবার শ্যামাপ্রসাদের বাংলায় তাঁর সাধের গেরুয়া সরকার শপথ নিল ব্রিগেড ময়দানের লাখো মানুষের সমাবেশ থেকে। রবীন্দ্র জয়ন্তীর পুণ্য দিনে নিখাদ বাঙালিয়ানার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এ এক অদ্ভুত সমাপতনই বটে। বিজেপির প্রধান চালিকাশক্তি তথা বিবেক আরএসএসের শতবর্ষ সবে পার হয়েছে। এমন সময় ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর ৭৩ বছর পর নিঃসন্দেহে বড়ো ঘটনা। তার চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে এই পরিবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ মানবসম্পদ বিশ্বগুরু রবীন্দ্রনাথের ১৬৬ তম জন্মদিবস উদযাপন। শপথের মঞ্চে আলো করে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সমেত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার কুশীলব ও বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। 
দীর্ঘ ৪৯ বছর পর আবার কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের সরকার। সার্থক হোক ডবল ইঞ্জিনের এই পথ চলা। প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছর পর, পশ্চিমবঙ্গের মসনদে সেই বিজেপি। সময়ের এই হিসাবই বলছে লড়াইটা ছিল দীর্ঘ। বছরের পর বছর ধরে একটু একটু করে যে ভিত তৈরি হয়েছিল, তার উপরই তৈরি হল বিজেপির আজকের সাম্রাজ্য। গরিব মানুষ হিন্দু মুসলমান বোঝে না। ধর্মের নিরিখে সমাজকে ছোটো ছোটো খোপে বিভক্ত করাও তাঁদের না পসন্দ। তাঁরা শিক্ষার আদর্শ পরিবেশ, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থান চায়। আগের সরকারের হাতে এরাজ্যের অর্থনীতির সর্বনাশের কথা বলেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। চারদিক গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে তোলার তুলনায় প্রকৃত উন্নয়নে মন দিতে হবে। একইসঙ্গে গত পাঁচ বছর বাংলার প্রায় সওয়া দু’কোটি মহিলার ক্ষমতায়নের প্রতীক লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধ হলেও দ্রুত অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের প্রতিশ্রুত ৩ হাজার টাকা দেওয়াও চালু করতে হবে সহজ শর্তে। বেকার শিক্ষিত যুবকদের তিন হাজার টাকার মাসিক ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিলম্ব হলে চলবে না। আর এসব হলেই প্রকৃত অর্থে সোনার বাংলার উন্মেষ হবে। ছাব্বিশের ভোটে গেরুয়া দলের পক্ষে জনসুনামি সত্যিকারের পরিণতি পাবে। কোনো দল নয় ব্যক্তিও নয় বাংলার মানুষ উপকৃত হোক। ২০৩১ সালের ভোট প্রচারে যেন কেউ বলতে না পারে বাংলায় একজনও ‘ঘুসপেটিয়া’ আছে।

সম্পর্কিত সংবাদ