ডঃ হরিস্বামী দাস: বাঙালি জীবনের আবেগ, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হল পয়লা বৈশাখ, অর্থাৎ বাঙালি নববর্ষ। প্রাচীন কাল থেকে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত বঙ্গাব্দ আজ শুধুই হিসেবের বর্ষপঞ্জি নয়, বরং বাঙালির জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক ঐতিহ্য।
শুধু বাংলা নয়, এই দিনটিতে গর্ব করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় বাঙালি জাতি। ধর্ম-বর্ণ-পার্থক্য ভুলে আমরা একসঙ্গে বলি ‘শুভ নববর্ষ’। হালখাতা, বৈশাখী মেলা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, লোকগান, পান্তা-ইলিশ, আলপনা আর নতুন জামাকাপড়-সব মিলে তৈরি হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক আবহ। মহা ধুমধামে শুরু হয় বাঙালির বর্ষবরণ। সবাই গেয়ে ওঠেন রবি ঠাকুরের গান, এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো। তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি, অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক এই দিনটির প্রতিটি অনুষঙ্গে আছে আমাদের মাটির গন্ধ, আমাদের ভাষার রঙ, আর আমাদের ইতিহাসের ধ্বনি।
এই নববর্ষ আমাদের জাতীয় গর্বও বটে। এখানে নেই কোনও ধর্মের বাধা, নেই জাতির বিভাজন-এ এক সর্বজনীন উৎসব। সেই জন্যই ঢাকা থেকে কলকাতা, বরিশাল থেকে বীরভূম-সর্বত্র এই দিনটি বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক।
তবে সময়ের স্রোতে নববর্ষ উদযাপনের ধরনে এসেছে কিছু পরিবর্তন। একসময়ের পল্লীজ জীবনকেন্দ্রিক, আচারনির্ভর উৎসব আজ হয়ে উঠেছে শহরকেন্দ্রিক, কিছুটা বাহ্যিকতার মোড়কে মোড়া। তাই সমাজ ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই পরম্পরাও বদলাচ্ছে। কোথাও তা শুধু রেস্তোরাঁর মেনুতে রয়ে গিয়েছে, কোথাও আবার ফেসবুক পোস্টে সীমাবদ্ধ। তবু আশার কথা-এই দিনটিকে ঘিরে নতুন প্রজন্মেও জাগছে এক আত্মিক টান, উৎসবকে নিজের করে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। তাই পরিবর্তন মানেই হারিয়ে ফেলা নয়, বরং পুরাতন ও আধুনিকের সংমিশ্রণেই ভবিষ্যতের পথ তৈরি হয়।
আজকের প্রজন্ম প্রযুক্তির জগতে থেকেও যদি এই দিনটিকে ‘আমার উৎসব’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তবেই আমাদের বাঙালিয়ানা জীবিত থাকবে। পয়লা বৈশাখ হোক সেই দিন, যেখানে অতীতের ঐতিহ্য, বর্তমানের চেতনা, আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন মিলিত হয়ে রচনা করে নতুন পথ-এক গর্বিত, জাগ্রত, আত্মবিশ্বাসী বাঙালির পথচলা। (লেখক জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষক, শোভানগর উচ্চ বিদ্যালয়, মালদহ)