


রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন থেকে মাত্র কয়েকমাস দূরে উত্তরপ্রদেশ। আর এমনই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নয়ডা থেকে মিরাটে স্লোগান উঠেছে, ‘বিজেপি হটাও কামধান্দা বাঁচাও!’ হঠাৎ এই উলটো সুর কেন? ‘আমরা কি বাঁচব না?’—নয়ডার হোসিয়ারি কারখানার শ্রমিকদের এই প্রশ্নই গত কদিন যাবৎ তাড়া করছে গেরুয়া শিবিরকে। কেননা, অগ্নিমূল্যের বাজারে শ্রমিকদের মজুরি এখনো মাত্র নয় হাজার টাকা। ওই সামান্য আয় থেকে ঘরভাড়া মেটাতে বেরিয়ে যায় চার হাজার টাকা। তিন কেজির যে গ্যাস সিলিন্ডার সংগ্রহ করা যেত ৯০ টাকায় সেটারই জন্য এখন গুনতে হচ্ছে ৪০০ টাকা! মজুরি বৃদ্ধির সমবেত দাবি বহুদিনের। অনেক টালবাহানার পর গতবছর তা বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু কত টাকা? মাত্র ৩৯ টাকা। অর্থাৎ এই বৃদ্ধির অঙ্ক পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব এবং শোষণের শিরোমণি দেশটিকেও লজ্জা দেবে। স্বভাবতই পুঞ্জীভূত হচ্ছিল ক্ষোভ। সোমবার তা ঝড় হয়েই যেন আছড়ে পড়ল যোগীরাজ্যের রাজপথে। অন্যদিকে, মিরাটে চারদিন ধরে চলছে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ। বুলডোজার নীতির প্রতিবাদে তাঁদের এই কর্মসূচি। সেখানকার বিজেপি এমপি বিখ্যাত ‘রামায়ণ’ টিভি সিরিয়ালের ‘রাম’—অরুণ গোভিল বিক্ষোভস্থলে না-যাওয়ায় ক্ষোভ বেড়েছে শতগুণ।
এই যেখানে লেজেগোবরে অবস্থা, সেই সাধের ‘রামরাজ্যের’ মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ রবিবারও বাংলায় ব্যস্ত ছিলেন বিজেপির হয়ে ভোটপ্রচারে। ফেরি করছিলেন বাংলায় ‘মোদির সুশাসন’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। আর ঠিক তখনই গোটা ভারতের সামনে দাউ দাউ করছিল যোগীরাজ্যে সুশাসনের আগুন! কেমন সেই সুশাসন, তা অবশ্য কারো অজ্ঞাত নয়। উত্তরপ্রদেশে বিভেদের রাজনীতি এক বিভীষিকার রূপ নিয়েছে। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং জোরপূর্বক রামমন্দির নির্মাণ দিয়েই যার সূচনা। ওইসঙ্গে গণতন্ত্রকে বলি দিয়ে আমদানি করা হয়েছে বুলডোজতন্ত্র। নারীর মানসম্ভ্রম মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত উত্তরপ্রদেশের দিকে। বলা বাহুল্য, ভিকটিমদের একটা বড়ো অংশই হল মুসলিম এবং গরিব ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষ। জাতপাতের ধুয়ো তুলে উচ্চবর্ণ সমাজের অত্যাচার এখনো চলছে বহাল তবিয়তে। ওইসব ক্রনিক সামাজিক ব্যাধির পাশাপাশি আর্থিক বৈষম্য কতখানি তার জ্বলন্ত প্রমাণ রাখছে নয়ডা-মিরাটের সাম্প্রতিক অশান্তি। ওই রাজ্যে হোসিয়ারি শিল্পে কারো বেতন নয় হাজার টাকা, কারো-বা তেরো হাজার। কনৌজ, কানপুর কিংবা বিজনৌর, কাটিহার... নয়ডার ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকার একাধিক সেক্টরে সারি দিয়ে রয়েছে হোসিয়ারি কমপ্লেক্স। নানাবিধ বস্ত্র কারখানার শ্রমিকদের কমবেশি জীবনযুদ্ধ এরকমই। বছরের পর বছর দাবি তোলা হলেও ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি হয়নি। গুরুগ্রামে ন্যূনতম মজুরি ১৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৯ হাজার টাকা।
কিন্তু বাকি জায়গায়গুলিতেও তা হবে না কেন? এই সংগত দাবিতেই, হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মীর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে শিল্পাঞ্চল, শ্রমিক মহল্লা। কিন্তু যোগী প্রশাসন অথবা মালিক পক্ষের কান অব্দি পৌঁছায়নি খেটে খাওয়া মানুষের কাতর আবেদন, কান্না। আর এজন্যই কদিন ধরে নয়ডায় চলছে বিক্ষোভ। কিন্তু জেলা প্রশাসনের হেলদোল ছিল না। নিরুপায় কারখানা শ্রমিকরা, মূলত মহিলারা নয়ডা থেকে দিল্লির সংযোগ সড়ক অবরোধ করেন। উত্তাল হয়ে ওঠে নয়ডা-দিল্লি সীমান্ত। নয়ডা-মিরাট রোড করিডর স্তব্ধ হয়ে যায়। ৯ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে মিরাট এক্সপ্রেসও সারাদিন বন্ধ ছিল। পুলিশ প্রশাসনের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন উত্তেজিত শ্রমিকরা। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রোডাকশন ইউনিট। সংঘর্ষ হয় তীব্র। সকাল থেকে রাস্তা আটকে থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়ে মানুষ। মিরাটে আবার ৮৬ বছরের পুরানো সেন্ট্রাল মার্কেটে বুলডোজার চালানোর প্রতিবাদে রাস্তায় অবস্থান বিক্ষোভ করছেন ব্যবসায়ীরা। ওই মার্কেট পুরোপুরি স্তব্ধ। আর পরিহাস কী নির্মম হতে পারে ভেবে দেখা যেতে পারে, তার মাত্র ঘণ্টাকয়েক আগে মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ বাংলায় ভোটপ্রচারে এসে দাবি করেন, ‘উত্তরপ্রদেশ ভারতের গ্রোথ ইঞ্জিনে পরিণত হয়েছে!’ এই যদি গ্রোথ ইঞ্জিনের চেহারা হয় তো গাড়ি শুধু থেমে বা থমকে যাবে না, যেকোনো মুহূর্তে আগুন জ্বলে যাওয়ার আশঙ্কাও সঙ্গী হবে। মণিপুর, অসম, ত্রিপুরার ছবিটা তো গোপন রাখা যায়নি। মণিপুর গত কয়েকবছর যাবৎ ভারতলজ্জা! সৌজন্যে গেরুয়া অপসংস্কৃতি, বিভেদের রাজনীতি। মোদি-শাহ যে গুজরাতের ভূমিপুত্র সেই রাজ্য তো দেশের মুখে চুনকালি লেপেছে সবার আগে। ভারতের বহুত্ববাদের সৌন্দর্য যারা দায়িত্বসহকারে ধ্বংস করে চলেছে তাদের কাছ থেকে প্রেরণাগ্রহণের দুর্দিন যেন কোনোদিন না আসে আমাদের। বাংলা আজও সারা দেশের প্রেরণা নিঃসন্দেহে, সারা ভারতই তা জানে।