পবিত্র রায়, রাজগঞ্জ: নাম তার বেলাকোবা। উত্তরবঙ্গের অত্যন্ত পরিচিত ও বর্ধিষ্ণু এই জনপদের প্রতিটি কোণায় জড়িয়ে রয়েছে বৈকুণ্ঠপুর রাজপরিবারের সুদীর্ঘ ইতিহাস। চিনি কারখানা থেকে আখের খেত, চা বাগানের উদ্যোগ, ফুটবলের জোয়ার কিংবা শিক্ষার প্রসার— বেলাকোবার অতীত ঐতিহ্য সমৃদ্ধ। রয়েছে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনাও। কিন্তু, কীভাবে এল এই ‘বেলাকোবা’ নামটি? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই সামনে উঠে আসে নানান ইতিহাস ও লোককথা।
ইতিহাসের পাতায় একসময় বেলাকোবা ছিল বৈকুণ্ঠপুর রাজপরিবারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তালুক। স্থানীয় প্রবীণদের দাবি, আনুমানিক ১৯৪০ সালে রাজা প্রসন্নদেব রায়কত এখানে একটি বিশাল চিনি কারখানা গড়ে তুলেছিলেন। কারখানার প্রয়োজনেই বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শুরু হয় আখের চাষ, পাশাপাশি নেওয়া হয় চা বাগান তৈরির উদ্যোগও। দেশভাগের পূর্বে এই কারখানায় উৎপাদিত চিনি পৌঁছে যেত তৎকালীন পূর্ববঙ্গের পচাগড়, দেবীগঞ্জ থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে।
তবে এই জনপদের নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানান মতবাদ। স্থানীয় সমাজকর্মী সুকুমার রায়ের মতে, রাজাদের আমলে এলাকায় ভেলু নামে এক প্রভাবশালী জোতদারের বাস ছিল। তাঁর নামানুসারেই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে ভেলা-কোপা শব্দটি। স্থানীয় রাজবংশী কিংবা কোচ-কামতাপুরী ভাষায় কোপা শব্দের অর্থ বাড়ি। অর্থাৎ ভেলা-কোপা বলতে বোঝাত ভেলুর বাড়ি। সময়ের স্রোতে কালক্রমে সেই ভেলা-কোপা শব্দটিই বিবর্তিত হয়ে আজকের বেলাকোবা রূপ ধারণ করেছে। ভেলু জোতদার ছাড়াও এলাকায় আরও এক জনপ্রিয় জোতদারের কথা শোনা যায়, যিনি নিয়মিত ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াতেন আর তাঁকে দেখার জন্য পিছু নিত গ্রামের কচিকাঁচরা।
স্বাধীনতার পর রাজা প্রসন্নদেব রায়কতের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে বেলাকোবা পোস্ট অফিসের নামকরণ করা হয় প্রসন্ননগর। কিন্তু, স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনসংখ্যা বহুগুণ বাড়লেও পোস্ট অফিসের পরিকাঠামোগত কোনো উন্নতি হয়নি। ফলে ডাক পরিষেবা পেতে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
অন্যদিকে, দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে বেলাকোবার জনবসতি। এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন থাকা সত্ত্বেও কোনো স্পেশাল বা এক্সপ্রেস ট্রেন এখানে থামে না। ফলে দূরের যাত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। এর পাশাপাশি রেলগেটের তীব্র যানজট প্রতিদিনের অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে এলাকার মানুষ। স্থানীয়দের দাবি, রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর ফ্লাইওভার তৈরির জন্য জমি মাপজোকের কাজ শুরু হলেও, সেই প্রকল্প ঠিক কবে আলোর মুখ দেখবে তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। • নিজস্ব চিত্র।



