Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পাক-আফগান যুদ্ধের নেপথ্যে

তালিবান সরকার ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতেই আফগানিস্তান তছনছ করতে যেন উঠেপড়ে লেগেছে ইসলামাবাদ! সপ্তাহখানেক ধরেই জঙ্গিদমনের নামে প্রতিবেশী দেশটির একের পর এক এলাকাকে নিশানা করছে পাকিস্তান

পাক-আফগান যুদ্ধের নেপথ্যে
  • ১ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তালিবান সরকার ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতেই আফগানিস্তান তছনছ করতে যেন উঠেপড়ে লেগেছে ইসলামাবাদ! সপ্তাহখানেক ধরেই জঙ্গিদমনের নামে প্রতিবেশী দেশটির একের পর এক এলাকাকে নিশানা করছে পাকিস্তান। পালটা জবাব দিচ্ছে কাবুলও। ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হওয়া লড়াই এখন এতটাই তীব্র যে দুই দেশই মনে করছে ‘ওপেন ওয়ার’ বা প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে পাক সেনারা কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের অন্তত তিনটি শহরে পালটা ড্রোন হামলা চালিয়েছে আফগানিস্তান। পাকিস্তানের দাবি, কাবুল আফগান তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে, যারা সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। এরপর আফগানিস্তানের ভিতরে গিয়ে তারা আশ্রয় নিচ্ছে। যদিও সেই দাবি মানতে নারাজ কাবুল। 

Advertisement

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, কাবুল-ইসলামাবাদ শত্রুতার সম্পর্ক আজকের নয়। দেশভাগের সময় পুশতুভাষী পাঠান অধ্যুষিত উত্তর-পশ্চিমের খাইবার-পাখতুনখোয়া প্রদেশটির অন্তর্ভুক্তি পাকিস্তানে হোক, তা চায়নি আফগানিস্তান। ভারত ভেঙে তৈরি হওয়া নতুন দেশটির অস্তিত্ব স্বীকার করা নিয়েও আপত্তি ছিল তাদের। ফলে পরবর্তী কালে খাইবার-পাখতুনখোয়ায় স্বাধীন পাশতুনিস্তান তৈরির দাবি উঠলে পর্দার আড়ালে থেকে সেই আন্দোলনকে হাওয়া দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ‘কাবুলিওয়ালার দেশ’টির বিরুদ্ধে। পাক-আফগান সংঘাতের দ্বিতীয় ক্ষেত্র সীমান্ত বিবাদ। যে আন্তর্জাতিক রেখাটি এই দুই দেশকে আলাদা করেছে, তার নাম ‘ডুরান্ড লাইন’। ১৮৯৩ সালে সংশ্লিষ্ট সীমান্তটি তৈরি করে তৎকালীন ভারতের ব্রিটিশ সরকার। যদিও পাকিস্তানের জন্মের পর সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাটিকে মানতে চায়নি আফগান প্রশাসন। ২০২১ সালে কাবুলের কুর্সিতে দ্বিতীয় বারের জন্য তালিবান এলে আরও জটিল হয় পরিস্থিতি। আন্তর্জাতিক সীমান্তের সমীক্ষা করে ইসলামাবাদের বেশ কিছু জমিকে পাঠানভূমির অংশ বলে দাবি করে তারা। ফলে দু’পক্ষে চড়তে থাকে পারদ। সম্পর্কের সর্বশেষ এই অবনতির শুরুটা গত বছরের অক্টোবর মাসে, আফগানিস্তানের বিদেশমন্ত্রীর ভারত সফরের পর থেকে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিকে সার্বিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্লেষকদের দাবি, ভারতের দিক থেকে আফগানিস্তানের প্রতি এই ‘বন্ধুত্ব’পূর্ণ অবস্থানের মূল কারণ হল বাণিজ্য। মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে পণ্য লেনদেন করতে হলে ইরান এবং কাবুলের রাস্তা ধরা ছাড়া নয়াদিল্লির কাছে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। তা ছাড়া স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিবেশীদের প্রতি কখনওই শত্রু মনোভাবাপন্ন মনোভাব ছিল না এ দেশের সরকারের। উলটে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলতে চায়। তাই ঐতিহাসিকভাবে ‘কাবুলিওয়ালার দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে বারবারই সেখানে মানবিক সাহায্য দেওয়া থেকে শুরু করে পরিকাঠামোগত সাহায্য করে গিয়েছে নয়াদিল্লি। ২০১৫ সালে ভারতীয় অর্থে তৈরি কাবুলের সংসদ ভবনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর জন্য ন’কোটি টাকা খরচ করেছিল এ দেশের সরকার। ঠিক এর পরের বছর সালমা বাঁধের উদ্বোধন করে আফগান সরকার। সেটিরও পরিকল্পনা থেকে নির্মাণকাজ, সবটাই করেছে ভারত। এ ছাড়া বাঘলান প্রদেশের রাজধানী পুল-ই-খুমরি থেকে কাবুল পর্যন্ত বিদ্যুৎ পরিকাঠামো পুনর্নির্মাণ, শিশু হাসপাতালের পুনর্নির্মাণ এবং অ্যাম্বুল্যান্স-সহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রমাগত সরবরাহ করে যাচ্ছে ভারত। ২০২১ সাল থেকে সেখানে শাতুত বাঁধ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন এ দেশেরই ইঞ্জিনিয়াররা।
উলটো দিকে আফগান ভূখণ্ড এবং সে দেশের জনগণকে ব্যবহার করাই ইসলামাবাদের উদ্দেশ্য। সম্প্রতি এই নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ। তাঁর কথায়, ‘কাবুলের জন্যেই আমাদের দেশে রক্তপাত থামছে না। ৬০ লক্ষ আফগান শরণার্থী রাখার মূল্য এই ভাবে চোকাতে হচ্ছে আমাদের।’ সম্প্রতি ছ’দিনের ভারত সফরে আসেন তালিবান সরকারের বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি। তিনি এ দেশের মাটিতে পা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাবুলের আকাশে ঢুকে পড়ে পাকিস্তানের লড়াকু জেট। পরে এই নিয়ে ইসলামাবাদ ফৌজের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ দফতরের (আইএসপিআর) প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরি বলেন, ‘আফগানিস্তানের মাটি আমাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেটা বরদাস্ত করা সম্ভব নয়।’ তখন থেকেই শুরু হয়েছে দু’দেশের লড়াই। যা বদলে গিয়েছে পুরোদস্তুর যুদ্ধে। পবিত্র রমজান মাসে আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ভারত। এক বিবৃতিতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘এই হামলায় মহিলা ও শিশুসহ সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছে। এটি মূলত নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার পাকিস্তানের আরেকটি চেষ্টা।’ ২০২২ সালে ইমরান খানকে সরানো, জেলে রাখা এবং তাঁর উপর অত্যাচারের অভিযোগ নিয়ে পাকিস্তান সরকার অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, এই অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে সে দেশের মানুষের নজর সরাতেও নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরাতে জাতীয়তাবাদের একটা হাওয়া তৈরি করেছে পাক সেনাবাহিনী। এই হাওয়া শেষ পর্যন্ত কোনদিকে মোড় নেবে স্পষ্ট নয় ইসলামাবাদের কাছেও!

সম্পর্কিত সংবাদ