Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পর্দা ফাঁস

দিল্লির মৌসম ভবন বা আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের দেওয়া পূর্বাভাসের বৈশিষ্ট্য হল, তা মিলতে পারে, আবার কখনো বা নাও পারে। ভোট এলে জনমত সমীক্ষার নামে যে পূর্বাভাস শুনতে অভ্যস্ত দেশের মানুষ, সেই আগাম অনুমানও অনেক ক্ষেত্রে মেলে না।

পর্দা ফাঁস
  • ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দিল্লির মৌসম ভবন বা আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের দেওয়া পূর্বাভাসের বৈশিষ্ট্য হল, তা মিলতে পারে, আবার কখনো বা নাও পারে। ভোট এলে জনমত সমীক্ষার নামে যে পূর্বাভাস শুনতে অভ্যস্ত দেশের মানুষ, সেই আগাম অনুমানও অনেক ক্ষেত্রে মেলে না। এই না মেলার উদাহরণ ভূরি ভূরি। কিন্তু সেই পূর্বাভাস বা অনুমানকে সম্পূর্ণ ‘সত্যি’ বলে যদি প্রচার করা হয়, তাকে মিথ্যাচার বলে। এই সারসত্যটা জেনেবুঝেও গত প্রায় এক বছর ধরে মোদি সরকার ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা দেশের মানুষকে ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে গিয়েছেন। এখন ধরা পড়ে অন্য ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিষয়: বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের স্থান নির্ধারণ। গত বছর মে মাসে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার বা আইএমএফ নিছক পূর্বাভাস দিয়ে জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠতে পারে ভারত। স্রেফ এই অনুমানকে সামনে রেখে খোল-করতাল নিয়ে দাপিয়ে প্রচার করতে শুরু করে দেয় মোদিবাহিনী। আইএমএফ-এর রিপোর্টকে বিকৃত করে প্রচার চলে, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়ে গিয়েছে ভারত! নীতি আয়োগের প্রধান কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি।’ নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমরা জাপানকে ছাড়িয়ে গিয়েছি।’ এমনকি সরকার বিবৃতি দিয়ে দাবি করে, ‘বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার পথে।’ দিকে দিকে স্লোগান ওঠে, ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়।’ চলে স্বপ্ন ফেরি। 

Advertisement

সেই আইএমএফ এখন পর্দা ফাঁস করে দিয়েছে। চলতি এপ্রিল মাসে তাদের শেষ রিপোর্টে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে, ভারত পঞ্চম থেকে চতুর্থ স্থানে এগোয়নি, উলটে ষষ্ঠ স্থানে নেমে গিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে আমেরিকা, চীন, জার্মানি, জাপান, ব্রিটেনের পর মোদির ভারতের স্থান। ভারত চতুর্থ হতে পারে ২০২৮ সালে। আইএমএফ বলছে, চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২৭)-র শেষে ভারতের জিডিপি হতে পারে ৪.১৫ ট্রিলিয়ন ডলার, সেখানে ব্রিটেনের হতে পারে ৪.২৬ ট্রিলিয়ন ডলার। জাপান যথারীতি ৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার নিয়ে চতুর্থ স্থানেই থাকবে। আইএমএফ-এর গত বছরের পূর্বাভাসকে ‘হয়ে গিয়েছে’ বলে কেন মোদি সরকার প্রচার চালাল, তার কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি কেন্দ্রের তরফে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের একাংশ এই অবনমনের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, মার্কিন ডলারের নিরিখে ভারতের টাকার অবমূল্যায়নই এর প্রধান কারণ। গত এক বছরে ডলার সাপেক্ষে টাকার দর ৮৫ থেকে নেমে ৯২-এর গণ্ডি টপকে গিয়েছে। ভারতের জিডিপির বহর ডলার মূল্যে রূপান্তরিত হওয়ায় অর্থনীতির কলেবর কম দেখাচ্ছে। উপরন্তু জিডিপি নির্ণয়ে নয়া পদ্ধতি অবলম্বন করায় খাতায়-কলমে ভারতের আর্থিক শক্তি কমেছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আসলে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হার নাকি যথেষ্ট ভালো। তাই আগামী বছরেই ভারত জাপানকে সিংহাসনচ্যুত করে চতুর্থ স্থানে উঠে আসবে। কিন্তু টাকার অবমূল্যায়ন রোধ করতে না পারলে কোন ম্যাজিকে তা সম্ভব— সেই উত্তর আপাতত মিলছে না। 
আসলে ভারতের আর্থিক চেহারা নিয়ে মোদিবাহিনী যত কম বলে, ততই মঙ্গল। অর্থনীতির সাধারণ জ্ঞান বলে, ভারতের জিডিপির হার বৃদ্ধির মূল কারণ দেশের বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যা। বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত যে স্থানেই থাকুক, তার কৃতিত্ব মোদির নয়। বরং প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাপকাঠিতে ভারত কতটা পিছিয়ে রয়েছে— তা ভেবে দেখতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। কারণ সেই ছবির আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে ভারতের জনগণের মাথাপিছু আয় ও বৈষম্যের আসল চেহারাটা। যে দেশগুলোর সঙ্গে অহরহ তুলনা টেনে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ান মোদি, মাথাপিছু আয়ে তারা প্রত্যেকেই ভারতের থেকে কয়েকযোজন এগিয়ে। যেমন, জাপানের মাথাপিছু আয় ৩৩ হাজার ৯০০ মার্কিন ডলার। ব্রিটেনের ৬১ হাজার মার্কিন ডলার। ভারতের সেখানে ২৮৮০ ডলার। এই ক্ষেত্রে বিশ্বের ২০০টি দেশের তালিকায় ভারতের স্থান ১৪৪-১৪৯-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আর বৈষম্যের চেহারাটা হল, দেশের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের হাতে ৬২ শতাংশ সম্পদ রয়েছে। শীর্ষ ১০ শতাংশ ৬৫-৭৭ শতাংশ সম্পদের মালিক। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা মোট সম্পদের ৩-৬.৪ শতাংশ সম্পদের মালিক। এই তীব্র অসাম্যের ছবি থাকা সত্ত্বেও পূর্বাভাসকেই ‘আসল’ বলে দাবি করে মোদি সাম্রাজ্য চলছে! চলছে বাস্তবতাকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু প্রকৃত সত্য যে চিরকাল চাপা থাকে না, তা আরেকবার প্রমাণিত।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ