


সংবাদদাতা, কাটোয়া: কাটোয়া শহরে এখন চর্চার কেন্দ্রে তৃণমূল নেতা বাবুলাল শেখ। পুরসভার সামান্য মজদুর পদে চাকরি করে সে। সেখান থেকে শহরের নামজাদা স্কুল জানকীলাল শিক্ষা সদনের পরিচালন সমিতির মাথায়। কোন যাদুবলে তা সম্ভব হল, ভাবাচ্ছে শহরের শিক্ষিত সমাজকে। পাশাপাশি, বাবুলাল সহ তার তিন ভাইয়ের উল্কার গতিতে উত্থানের কাহিনিও শহরের বাসিন্দাদের মুখে মুখে ফিরছে। তিন ভাই-ই এখন পুলিশের হেপাজতে। কিন্তু, তাদের নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। কেউ কেউ বাবুলালদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দক্ষিণী সিনেমার চিত্রনাট্যেরও তুলনা করছেন।
শহরে জমি-জায়গা দখলদারি থেকে বালিঘাটের একছত্র আধিপত্য—সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করত বাবুলাল বাহিনী। তৃণমূলের জমানায় কাটোয়া শহরে গড়ে উঠছে একাধিক বহুতল। সেখানেও সিণ্ডিকেট ব্যবসার মাথায় গ্যাংস অব বাবুলাল। একদা কলেজ রাজনীতি করত সে। রাজ্য রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান হতেই ভিড়ে যায় তৃণমূলে। কাছে টেনে নেয় বিরোধী ছাত্র সংগঠনের একঝাঁক তরুণকে। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি বাবুলালকে। ওই তরুণদের নিয়ে শুরু করে দেয় দুনিয়াদারির রাজনীতি। মাথার উপর হাত এসে পড়ে জেলার অনেক তাবড় তৃণমূল নেতার। বাবুলালের বৈভব বাড়তে থাকে দ্রুত গতিতে। বদলে যায় তার জীবনযাত্রার মানও।
স্টেডিয়াম পাড়াতে বিশাল বিলাসবহুল বাড়ি। ভাইদের নিয়ে নিয়মিত ছুটি কাটাতে বাইরে যেত। ফূর্তির জন্য ওড়াত দেদার টাকা। অভিযোগ, বাবুলালের এইসব কাজকর্ম নিয়ে সবকিছু জানলেও তৃণমূল নেতারা কিছু বলতেন না। উল্টে দিনের পর দিন প্রশ্রয় দিয়ে গিয়েছেন। বালিঘাটের নিয়ন্ত্রণ থেকে শহরের ওয়ান ফিগার জুয়া চলত বাবুলালেরই অঙ্গুলি হেলনে। জুয়ার বিষয়টি তদারকি করত বাবুলালের মেজ ভাই ছোট্টু শেখ। এক লটারি বিক্রেতা জানান, শহরের কয়েকটি ক্লাবেও এমন সর্বনাশা লটারির কারবার চলত রমরমিয়ে। সাধারণ মানুষের কষ্টের পয়সা জুয়ার মাধ্যমে কার্যত লুট করে কার্তিক লড়াইয়ে মেতে উঠল ওই ক্লাবগুলি। নামিদামী বিদেশি ব্যাণ্ড থেকে চোখ ধাঁধানো আলোয় সাজিয়ে তুলত শহর। অন্যদিকে, সর্বস্ব হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতেন শহরের একাধিক বাসিন্দা। এখনও হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যেম নাকি খেলা হয়। বাসিন্দাদের দাবি, ধৃত তিন ভাই সহ শহরের অনেকেই রয়েছে যারা ওয়ানফিগার লটারির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত৷ অবিলম্বে পুলিশ তাদের চিহ্নিত করুক। ধৃত তিন ভাইকে জেরা করলেই সব বেরিয়ে আসবে। ওদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে তদন্ত হোক৷
শহরের এক শিক্ষক বলছিলেন, স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ পরিচালন সমিতিতে বাবুলাল শেখ পার্সন ইন্টারেস্টেড এডুকেশন পদে ঢুকেছিল প্রভাব খাটিয়ে৷ তৃণমূলের একাংশ বলছে, বাবুলালদের তিন ভাইয়ের দাপটের জেরেই তৃণমূলের উপর ক্ষোভ বেড়েছিল শহরবাসীর। নেতাদের অনেকেই তা টের পাননি৷ অনেকেই বলছেন, কাটোয়ার এক পুলিশ অফিসার বাবুলালের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন৷ ওই অফিসারের সঙ্গে তিন ভাইয়ের ছবি সামাজিক মাধ্যমে দেখে শহরের বাসিন্দারা একটু সমীহ করে চলতেন।
বাবুলালের পকেটে সারাক্ষণ থাকত দামি কোম্পানীর সিগারেট থেকে পানীয়৷ শহরের বাসিন্দারা এখন চাইছেন, বাবুলালদের এইসব সাম্রাজ্য নিয়ে সঠিক তদন্ত হোক৷ তাদের এমন বিলাসবহুল জীবনযাপনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হোক। অর্থের জোগানদার কারা ছিলেন, কারা বাবুলালদের থেকে লাভবান হতেন—এসবের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক।