সায়নদীপ ঘোষ, কলকাতা: দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। শিউলি আর ছাতিমের গন্ধে ভরেছে আকাশ। আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা। তারপরেই সপরিবারে বাপের বাড়ি ফিরবেন দেবী দুর্গা। তাঁকে স্বাগত জানাবে কলকাতার বিভিন্ন পাড়া। প্রতিটি পুজো মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রকাশ্যে আসছে শিল্পীদের ভাবনা। বাবুবাগান ও সেলিমপুরে যেতেই চোখে পড়ল এই বিশেষ আয়োজনের একাধিক ছবি।
বর্তমানে গোটা পৃথিবী ভোগবাদের লেলিহান শিখায় দাউদাউ করে জ্বলছে। চারিদিকে শুধুই হিংসা আর হানাহানি। একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে বিভিন্ন দেশ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে রণক্ষেত্র। এই অবস্থায় মনের দরজা খোলার বার্তা দিচ্ছে বাবুবাগান সর্বজনীন। ৬৫ তম বর্ষে তাদের ভাবনা ‘কপাট’। রূপায়ণে শিল্পী রূপচাঁদ কুণ্ডু। মণ্ডপে প্রবেশ করতেই নজরে এল কয়েকশো দরজা। সেই দরজার উপর হরেক রকমের ছবি ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পীরা। একইসঙ্গে চলছে দেবী প্রতিমা নির্মাণের কাজ। শিল্পী জানান, চারিদিকের এই হট্টগোলের কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে মানুষের মনের দরজা। তাতেই ধাক্কা দিচ্ছে বাবুবাগান। কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসার চাপে বন্ধ থাকা এই দরজাটা একবার খুললেই প্রবেশ করবে আলো, বাতাস। শান্ত হবে মন। দূর হবে বস্তুবাদ ও ভোগবাদের যাবতীয় অন্ধকার। আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন ঘটবে। দরজার ভিতর দিয়ে প্রবেশ করা সেই আলো পৌঁছে দেবে দেবী মহামায়ার কাছে। মনে পড়ে যাবে রবি ঠাকুরের গান, ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসছে জ্যোতির্ময়, তোমারই হউক জয়...।’ সম্পাদক সুমন চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘মনের এই লৌহ কপাট খুলতে পারলেই মুছে যাবে তুমি, আমির বিভেদ। প্রকাশ পাবে সৌন্দর্য আর জ্ঞানের আলো। তবে তার জন্য সাধনা করতে হয়। মণ্ডপের প্রতিটি দরজায় সেই ভাবনা ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।’ বাবুবাগান থেকে কিছুতেই গেলেই সেলিমপুর পল্লি। সেখানে ঢুকতেই কানে এল ঝালাইয়ের কাজের শব্দ। দেবীকে যেন সবকিছু অর্পণ করতে প্রস্তুত শিল্পীরা। ৮৯ তম বর্ষে সেটাই বোঝাতে চাইছে দক্ষিণ কলকাতার এই পুজোটি। এবছর তাদের থিম ‘নৈবেদ্য’। সৃজনে শিল্পী সৌভিক কালী। প্রতিমা নির্মাণে পরিমল পাল। নৈবেদ্য ছাড়া পুজো হয় না। তবে এবারের পুজোয় সেলিমপুরে শুধু ফুল, ফলের নৈবেদ্য থাকবে না। এবার নিজেদের ষড়রিপুকে দেবীর সামনে নিবেদন করবেন দর্শণার্থীরা। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য— এই ছয়টি রিপু মানবজীবনের অন্যতম শত্রু। এর ফলে নষ্ট হয় শান্তি। হারিয়ে যায় বিবেক। তবে দেবীর পায়ে এই ষড়রিপু অর্পণ করতে পারলেই দূর হবে দম্ভ, লালসা। মণ্ডপের আনাচে কানাচে সেটাই ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। লোহার কাজের সঙ্গে থাকছে বিভিন্ন ধরনের পেন্টিং। সবকিছুতেই রয়েছে শুদ্ধিকরণের বার্তা। যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মাঝে রয়েছেন মহিষাসুরমর্দিনী। তিনিই যেন ‘ষড়রিপু’ নামক এই অসুরকে বধ করছেন।