নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও সংবাদদাতা, রামপুরহাট: ‘ছাত্রাবস্থা থেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কোনোদিন দুর্নীতিতে জড়িত হইনি। জীবনে এক পয়সাও নিইনি কোনো কাজের বিনিময়ে।’ সুইসাইড নোটে একথা লিখে আত্মঘাতী হলেন পাঁচবারের প্রাক্তন বিধায়ক, রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার সকালে রামপুরহাটে তাঁর বাড়ির নীচে দলীয় কার্যালয় থেকে আশিসবাবুর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। সেই ঘর থেকেই মিলেছে সুইসাইড নোট। তার ছত্রে ছত্রে বর্ণিত হয়েছে চরম মানসিক যন্ত্রণার কথা। তিনি লিখেছেন, ‘রাজনীতিতে আসাটাই আজ ভুল মনে হচ্ছে। আমার বংশের কেউ যেন রাজনীতি না করে।’ একেবারে শেষে লেখা, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।’
এদিন ভোরে আশিসবাবুর কার্যালয় ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তাঁর ছোটোভাই প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেন, সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে আশিসবাবুর দেহ। মুহূর্তের মধ্যে কান্নার রোল ওঠে পরিবারে। পুলিশ এসে দরজা খুলে দেহ উদ্ধার করে রামপুরহাট মেডিকেল কলেজে পাঠায়। স্থানীয় ও তৃণমূল সূত্রে খবর, প্রাক্তন অধ্যাপক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনের শেষ দিনগুলিতে অত্যন্ত মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। সুইসাইড নোটেই তার উল্লেখ রয়েছে। তারাপীঠ রামপুরহাট উন্নয়ন পর্ষদে (টিআরডিএ) তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে পালাবদলের পর। এর প্রতিবাদে তিনি লিখেছেন, ‘আমি টেন্ডার কমিটিতে ছিলাম না, প্ল্যান পাশ বা নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট ইস্যুর এক্তিয়ারও আমার ছিল না। সাধারণ মিটিং ছাড়া আমার আর কোনো দায়িত্ব ছিল না। অথচ আমাকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে।’ তাহলে কি দলীয় রাজনীতির পঙ্কিল আবর্তেই আত্মঘাতী হলেন আজীবন সামাজিক সততা বজায় রেখে চলা বর্ষীয়ান আশিসবাবু? রবিবার দিনভর এই প্রসঙ্গই ঘুরেফিরে এসেছে বীরভূমের রাজনৈতিক মহলে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শোকপ্রকাশ করে বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখের ঘটনা। ২০০৬ সালে যখন আমরা গুটিকয়েক বিরোধী বিধায়ক ছিলাম, তখন উনিও বিধায়ক ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই এই খবরে আমি শকড।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশকে ওঁর পরিবারের পাশে থাকতে বলেছি। আমাদের বোলপুরের এমপি অসিত মাল ওঁর বাড়িতে গিয়েছেন। তাঁর ফোনের মাধ্যমে ভিডিয়ো কলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয়েছে।’
দীর্ঘদিনের সহকর্মীর এভাবে মৃত্যুতে তিনি ‘গভীরভাবে বিচলিত’ বলে জানিয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘গত কয়েক মাসে আশিসদাকে সীমাহীন মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়েছে। রামপুরহাটের সার্বিক উন্নয়নে তাঁর অজস্র ভূমিকা থাকলেও ধারাবাহিক মানসিক অত্যাচার তিনি আর সহ্য করতে পারলেন না।’ তবে এ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘আমি ওঁদের (পরিবারের লোক) কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আপনাদের কেউ উত্ত্যক্ত করেছিল কি না। ওঁরা বললেন, বিজেপির ধ্রুব সাহা জেতার পর আশিসবাবুর থেকে আশীর্বাদ নিয়ে এসেছেন। উনি খুব পিসফুলি ছিলেন ওখানে।’ টিআরডিএ বা পুলিশ তাঁকে কোনো নোটিস পাঠিয়ে তলব করেনি বলেও জানান শুভেন্দু।
স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী এই দাবি করলেও আশিসবাবুর স্ত্রী সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় ওঁর নামে প্রতিনিয়ত চোর অপবাদ ও মিথ্যা ছড়ানো হচ্ছিল।’ ভাইয়ের স্ত্রী দীপা বন্দ্যোপাধ্যায় কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘দাদা কারও কাছে এক কাপ চাও খায়নি। মিথ্যা অপবাদ আর অপমান সহ্য করতে না পেরে এই চরম পথ বেছে নিল দাদা।’ এদিন সকালেই রামপুরহাট মেডিকেল কলেজে ভিড় জমান জেলা তৃণমূলের একাধিক শীর্ষ নেতৃত্ব সহ দলীয় কর্মী-সমর্থক। আসেন অন্যান্য দলের নেতারা। এই ঘটনায় বীরভূম জেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।