সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় গোটা রাজ্যের মধ্যে নজির গড়ল আসানসোল জেলা হাসপাতাল। ইমপ্লান্ট সার্জারিতে সফল হলেন চিকিৎসকরা। অর্থাৎ, ক্যানসারে আক্রান্ত স্তনকে অপারেশন করে বাদ দিয়ে সেখানে কৃত্রিম স্তন ইমপ্লান্ট বা প্রতিস্থাপন করলেন তাঁরা। স্বাস্থ্যদপ্তরের কর্তাদের দাবি, শুধু রাজ্যে নয় দেশের প্রথম কোনও জেলা হাসপাতালে এই ধরণের অপারেশন হল। কলকাতার পিজি, এমআর বাঙুর ও জেলা হাসপাতালের মোট সাতজন বিশিষ্ট শল্য চিকিৎসক একটানা আড়াই ঘন্টা অপারেশন করে সফল হন। কৃত্রিম স্তন প্রতিস্থাপনে মানসিক অবসাদ কাটিয়ে উঠেছেন ক্যানসার আক্রান্ত যুবতীও। তিনি একজন দরিদ্র পরিবারের বধূ। বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। তাঁর অবস্থার কথা বুঝেছিলেন চিকিৎসকরা। তাই, কলকাতাতে গিয়ে চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দেননি। সেক্ষেত্রেও বধূর পরিবারের প্রচুর খরচ হতো। সেটা ঠেকাতেই কলকাতার সেরা হাসপাতালের চিকিৎসকরা জেলা হাসপাতালেই অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন। চিকিৎসকরা এই ব্যবস্থার নাম দিয়েছেন ‘পিঙ্ক করিডর’।

অপারেশনে নেতৃত্ব দেন স্বাস্থ্যদপ্তরের ব্রেস্ট ক্যান্সার কেয়ার সার্ভিসের নোডাল অফিসার তথা পিজি হাসপাতালের বিশিষ্ট স্তন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ দীপ্তেন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, ‘দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে স্তন ক্যান্সার। মহিলাদের মদ্যপান ও ধূমপান এই রোগ বৃদ্ধির বড় কারণ। বিপুল পরিমাণ মহিলা যেভাবে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন, তাতে কোনও রাজ্যে একটি বা দু’টি জায়গায় চিকিৎসা হলে রোগীরা সঠিক পরিষেবা পাবেন না। আমাদের রাজ্য সেক্ষেত্রে এগিয়ে। ক’বছর আগেই আমরা রাজ্যের ৩৭টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এর চিকিৎসা শুরু করেছি। সারা দেশের মধ্যে প্রথম কোনও জেলা হাসপাতালে ব্রেস্ট ইমপ্লান্ট হল।’
জানা গিয়েছে, সাত মাস আগে সালানপুরের ওই বধূ স্নান করার সময়ে স্তনে একটি নুড়ি পাথরের মতো শক্ত মাংসপিন্ডের উপস্থিতি অনুভব করেন। মহিলা দ্রুত আসানসোল জেলা হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছে আসেন। তাঁরা প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানিয়ে দেন, স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত মহিলা। স্তন বাদ পড়বে অপারেশনে। মুষড়ে পড়েন তিনি। কাতর আর্জি জানান, অঙ্গহানি যাতে না ঘটে। তখনই চিকিৎসকরা তাঁর স্তন পুনর্গঠনে উদ্যোগী হন। জেলা হাসপাতালের ক্যান্সার ইউনিটের চিকিৎসক অমিত মুখোপাধ্যায় যোগাযোগ করেন দীপ্তেন্দ্রবাবুর সঙ্গে। সার্জারির পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। কিন্তু বাধ সাধে বধূর পরিবারের আর্থিক অবস্থা। কৃত্রিম স্তন মূলত তৈরি হয় সিলিকনে। সেটাই কেনার সামর্থ্য ছিল না। তখন অমিতবাবুরা সিদ্ধান্ত নেন, আসানসোল হাসপাতালেই অপারেশন হবে। যাবতীয় খরচও জোগাতে এগিয়ে আসে আসানসোল পুরসভা। মঙ্গলবার ছিল অপারেশনের দিন। সকাল ন’টা থেকে শুরু হয় অপারেশন। আসানসোল জেলা হাসপাতালের শল্য বিভাগের প্রধান রুহুল আমিন বলেন, ‘আমাদের এখানে স্তন ক্যান্সারের অপারেশন হয় মাসে ৫-৬টি। কিন্তু স্তন পুনর্গঠন বা ইমপ্লান্ট সার্জারির অভিজ্ঞতা এই প্রথম।’ হাসপাতালের ক্যান্সার ইউনিট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন বছরে আসানসোল জেলা হাসপাতাল থেকে ২৪২ জন মহিলার স্তন ক্যান্সার ধরা পড়েছে। শেষ সাত মাসে এখান থেকে ৩৫ জনেরও বেশি রোগীর স্তন ক্যান্সারের অপারেশন হয়েছে। জেলা মুখ্যস্বাস্থ্য আধিকারিক শেখ মহম্মদ ইউনুস বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্যদপ্তরকে জানিয়েছি, স্তন পুনগর্ঠনের মতো জটিল অস্ত্রোপচার জেলা হাসপাতালে শুরু হয়েছে। প্রথমবার পুরসভা অর্থ সাহায্য করেছে। পরবর্তী ক্ষেত্রে আমাদের জন্য এনিয়ে যেন ফান্ড বরাদ্দ করা হয়।’ জেলা হাসপাতালের সুপার নিখিল চন্দ্র দাস বলেন, ‘জেলা হাসপাতালের ইতিহাসে আজকের দিন মাইল ফলক হয়ে থাকবে।’