অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: আধুনিকতার মোড়কে পুরনো ঐতিহ্য ফিরছে বাঙালির ঘরে ঘরে। আগে গ্রামীণ বাংলার বহু বনেদি বাড়িতে শোভা পেত শাল, সেগুন কাঠের নানা আসবাব। শিল্পীদের হাতের সুক্ষ্ম কারুকাজ করা নানা আসবাব দেখে মুগ্ধ হতেন অনেকে। দিন বদলের সঙ্গে বাঙালির রুচিরও পরিবর্তন ঘটেছিল। পুরনো কারুকাজ করা কাঠের আসবাবের বদলে জায়গা করে নিয়েছিল প্লাস্টিক, প্লাইউডের আসবাবপত্রে। তবে আবার পুরনো ঐতিহ্য ফিরছে। আধুনিকতার মোড়কে পুরানো ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়ে কাঠের নানা আসবাবে শোভা বাড়াচ্ছেন শিল্পীরা। সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে কাঠের দুর্গা থেকে আফ্রিকান ডলের আদলে নানা মডেল। এসব বরাত আসায় আবার কাটোয়ার অগ্রদ্বীপের কাঠপুতুল শিল্পীদের হাসি চওড়া হচ্ছে।
কাটোয়ার অগ্রদ্বীপের কাঠপুতুল শিল্পী শম্ভুনাথ ভাস্কর কাঠের রাবণ তৈরি করে ১৯৬৬সালে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার আনেন। তিনি তখন রামায়ণ থেকে মহাভারতের নানা চরিত্র কাঠের মধ্যে ফুটিয়ে তুলে বিখ্যাত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই কাজে পরবর্তী সময়ে চাহিদা কমেছিল। এখন শম্ভনাথবাবুর নাতি অক্ষয় ভাস্কর নতুন প্রজন্মের শিল্পী। আধুনিকতার মোড়কে পুরনো ঐতিহ্য ফিরছে। তাতে অক্ষয়ের মত শিল্পীরা নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। কারণ আফ্রিকান ডলের আদলে বাঙালির কাঠের দুর্গাপ্রতিমার চাহিদা বেড়েছে। পাঁচ, ছ’ফুটের দুর্গা বাড়িতে শোভা বাড়ানোর জন্য বরাত দিচ্ছেন শিল্পীদের।
অক্ষয় বলেন, দাদুরা যেসময় কাজ করতেন তখন বাঙালি শিল্পীদের কাজ দেখানোর স্বাধীনতা দিতেন। পরে সেসব উঠে গিয়েছিল। এখন আবার দেখছি সেইসব পুরনো কাজগুলিকেই নতুনত্বের ছোঁয়া দিয়ে তৈরি করাতে চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। নানা ধরনের কারুকাজ করা আসবাব তৈরি করে দিতে হচ্ছে। আর তা রাজ্যের বিভিন্ন জায়গার মানুষ বাড়িতে ব্যবহার করছেন।
কাটোয়া-২ ব্লকের অগ্রদ্বীপের কাঠপুতুল শিল্পীদের আদি বাস পূর্বস্থলীর নতুনগ্রামে। কয়েক দশক আগে তাঁরা কাজের সুবিধার্থে অগ্রদ্বীপ স্টেশনের কাছে চলে এসেছেন। কারন নতুনগ্রাম যেতে গেলে সেই অগ্রদ্বীপ স্টেশনেই নামতে হবে। তাই অগ্রদ্বীপের শিল্পীরা সেখানেই বসবাস করছেন। কাঠের উপর ছেনি হাতুড়ি দিয়ে নানারকম শিল্পকলা ফুটিয়ে তোলেন তাঁরা।
তবে কাঠের পুতুল আর পেঁচা তৈরিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন অগ্রদ্বীপের শিল্পীরা। তারপর ইন্টারনেটের যুগে আফ্রিকান ডল দেখে তা কাঠ দিয়ে তৈরি করতেই এক অসাধারন শিল্পকলা ফুটে ওঠে। আর তা দেখেই চমকে উঠে এবার সেই আফ্রিকান ডলের আদলে বাঙালির দুর্গাপ্রতিমাও ইতিমধ্যে নজর কেড়েছে। তা আবার স্থান পেয়েছে বিদেশে। অগ্রদ্বীপের শিল্পী অক্ষয় ভাস্করের হাতে তৈরি নানারকম আফ্রিকান ডল, রাশিয়ান ডল দেখেই মজে যান বিশ্ববাংলার আধিকারিকরা। তাই আফ্রিকান ডলের আদলে বাঙালি ঘরানায় কাঠের দুর্গা প্রতিমা গড়ার ভার দেন অক্ষয়কে। অক্ষয় বলেন, আফ্রিকান ডলের আদলে দুর্গা তৈরি করতে গিয়ে বাঙালি ঘরানাকে বাদ দিইনি। এক ফ্রেমের মধ্যে সপরিবারের দুর্গা কাঠের মধ্যে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। আগের অনেক দুর্গাপ্রতিমা আমি কলকাতার রাজারহাটে বিশ্ববাংলার অফিসে দিয়েছি। তাছাড়া আগে আমি রাশিয়ান ডল তৈরি করে স্পেনের এক মিউজিয়ামে পাঠিয়েছি। এখন কাঠের দুর্গা রাজ্যের বহু থানা, বাড়ি, কারখানাতে শোভা বাড়ানোর জন্য বরাত দিচ্ছেন। আমাদের ফুরসত মিলছে না।