সুখেন্দু পাল, রসুলপুর: দোকান বন্ধ করে অন্যান্য দিনের মতোই শুক্রবার নিশ্চিন্তে ঘুমাতে গিয়েছিলেন রসুলপুরের সুশীল রায়। ইচ্ছে ছিল ছেলেকে একটা ভাল বাড়ি করে দেওয়ার। শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখে মুখে জলের ঝাপটা নিয়ে দোকানের যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। দেরি হয়ে গেলে বিক্রিবাটা কম হবে। তাই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলেকে বলতে থাকেন, ‘রোজ তোর দেরি হয়। তাড়াতাড়ি কর দোকান খুলতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ দোকানের দিকে পা বাড়ালেন তিনি। কিছুটা যেতেই চমকে উঠলেন। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। একের পর এক দোকান ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রসুলপুর বাজার এলাকার প্রায় ২০০টি দোকান এক রাতেই বুলডোজারের ধাক্কায় মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে সুশীলবাবুর দোকানও আছে।
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন লুচি বিক্রেতা সুশীলবাবু। বলতে থাকেন, এর থেকে আমাদের বুকের উপর বুলডোজার চালিয়ে দিতে পারত। তাহলে এভাবে তিলে তিলে মরতে হত না। এই দোকান করেই সংসার চালাচ্ছি। এখন কী হবে? সরকার এভাব আমাদের পেটের ভাত কেড়ে নিল! কল্পনাও করতে পারিনি।
পাশের এক চা বিক্রেতা বললেন, গভীর রাতে এভাবে একের পর এক দোকান ভেঙে দেওয়া হবে বলে ভাবতে পারিনি। আমরা তো রাষ্ট্রের প্রজা। প্রজারা ভাল না থাকলে পরিকাঠামোর উন্নতি করে কী লাভ! পেটের ভাতের জোগাড়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার পর দোকান ভাঙলে অসুবিধা হত না। কিন্তু, এখন আমরা যাব কোথায়? যাঁদের দোকান গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁদের কেউ ২০ আবার কেউ ২৫ বছর ধরে স্টেশনের পাশে ব্যবসা করছিলেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দিনের দিকে বুলডোজার চালালে বিক্ষোভ হতে পাবে। সেকারণে সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন বুলডোজার চালানো হল। কারও বাড়িতে বয়স্ক মা রয়েছেন, আবার কেউ নিজে অসুস্থ। দোকানের আয় থেকেই সংসার চলত। সেই আয়ের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল।
কয়েকদিন আগে বর্ধমান ও মেমারি স্টেশন চত্বরে দোকান ভেঙে দেওয়া হয়। সেখানেও অনেকেই ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবসা করছিলেন। এবার বুলডোজার চালানো হল রসুলপুর বাজারেও। শুক্রবার রাতেও এখানে চা বা ফাস্টফুডের দোকান ছিল। এলাকা ছিল জমজমাট। দোকানে বসেই আলোচনা চলছিল ককরোচ পার্টির আন্দোলন নিয়ে। তারই মধ্যে কেউ কেউ কেন্দ্রীয় সরকারের হয়েই কথা বলছিলেন। তখনও জানতেন না তাঁদের জীবনেই নেমে আসছে চরম আঘাত। বুলডোজারের আঘাতে সব ওলটপালট হয়ে গেল। হই হাসিমস্করা, ইয়ার্কিঠাট্টা উধাও। রসুলপুরে শুধুই হাহাকার।