রামকুমার আচার্য, আরামবাগ: সময়—মাত্র তিন অক্ষরবন্ধ কতকিছু বদলে দেয়! হাতে গরম প্রমাণ একুশে জুলাই। রাত পোহালে শহিদ দিবস। গত বছর এই দিনে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে আরামবাগ মহকুমাজুড়ে কলকাতায় যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল তুঙ্গে। তৃণমূল নেত-কর্মীদের মধ্যে সাজসাজ রব। আর এ বছর একুশে জুলাইয়ে একদিন আগে আরামবাগের তৃণমূল একেবারে নিশ্চল, নির্বিকার! নেতাদের মধ্যে কর্মী-ভিড় বাড়ানোর প্রতিযোগিতা নেই। অতঃপর, বাস বুক করার তাগিদ নেই। দলীয় কর্মীদের মধ্যে ব্যানার-পোস্টার লাগানোর যুদ্ধ নেই। বছর ঘোরার আগেই মমতার সেই তৃণমূল আর নেই!
গত বছর ঠিক এই দিনে রাস্তায় বেরিয়ে বাস না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছিলেন যাত্রীরা। সব রুটের অধিকাংশ বাস তুলে নিয়েছিলেন তৃণমূল নেতারা। এবার সেই দৃশ্য উধাও। এখনও পর্যন্ত কোনো বাসই তৃণমূলের তরফে বুকিং করা হয়নি। আরামবাগ মহকুমা থেকে কারা যাবেন, তা নিয়ে সংশয়ে তৃণমূল নেতারা। ধন্দে দলীয় কর্মীরাও। তৃণমূলের অনেক নেতা স্বীকার করে নিচ্ছেন, এবার বাস বুকিং করে কলকাতায় যাওয়া হবে না। সেই পরিস্থিতি নেই। তবে, যে যাঁর মতো বাস, ট্রেন বা ছোট গাড়িতে করে যাবেন।
আরামবাগের তৃণমূল নেতা পলাশ রায় বলছিলেন, ‘দলের বহু কর্মী ঘর ছাড়া। অনেকেই আতঙ্কে। এই অবস্থায় সব জায়গা থেকে কর্মীদের একসঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অসুবিধা রয়েছে। তবে দলের বিভিন্ন স্তরের কর্মীরা নিয়মিত যোগাযোগের মধ্যে রয়েছেন। তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে বাসে, ট্রেনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে কলকাতায় বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম চত্বরে শহীদ দিবসের সভায় যাবেন।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোঘাটের এক ব্লক নেতার কথায়, ‘একুশে জুলাইয়ের সভায় যোগ দিতে যাওয়া নিয়ে চাপ আসছে। তবু আগের দিন যাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে ভাবছি।’
ফলে, বাস বুকিংয়ের তোড়জোড় নেই কালীঘাট পন্থী তৃণমূল কিংবা ঋত-তৃণমূলের মধ্যে। হুগলি ইন্টার রিজিয়ন বাস মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘২১ শে জুলাই উপলক্ষে এখনও পর্যন্ত আমাদের কাছে বাস বুকিং করা নিয়ে কেউ যোগাযোগ করেনি।’ একই বক্তব্য আরামবাগ বাস মিনিবাস ওপারেটার্স ওয়েলফেয়ার সমিতির সম্পাদিকা মধুমিতা ভট্টাচার্যেরও।’
তৃণমূলের এহেন দুর্দশা দেখে কটাক্ষা করতে ছাড়ছে না বিজেপি। দলের পুরশুড়ার বিধায়ক বিমান ঘোষ বলেন, ‘তৃণমূল দলটা কার্যত উঠে গিয়েছে। ওরা এখন দু’টি ভাগে বিভক্ত। আরামবাগে আপাতত কোনো তৃণমূল নেতাকেই রাস্তায় দেখা যাচ্ছে না। তাই ওঁদের দলের কর্মীরা বিভ্রান্ত। আগে মানুষকে হুমকি দিয়ে, টাকা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। এখন রাজ্যে পরিবর্তন হওয়ায় কেউ আর যাবেন না।’
ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউস চত্বরে শহিদ দিবস পালন ছিল তৃণমূলের সাংগঠনিক ক্ষমতা প্রদর্শনের সেরা বিজ্ঞাপন। একুশে জুলাইয়ের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই দলের বিভিন্ন স্তরে প্রস্তুতি সভা হতো। ব্যানার, পোস্টারে ঢেকে যেত আরামবাগ শহর। দু’দিন আগে থেকে রাস্তায় বাসের সংখ্যাও কমে যেত। একুশে জুলাই খাঁ খাঁ করত আরামবাগ বাসস্ট্যান্ড। যাত্রীরা বেছে নিতেন অটো, টোটো। এবার ছবিটা সম্পূর্ণ অন্য। পালাবদল হতেই আরামবাগ তৃণমূলের একাধিক নেতা নানা অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। অনেকেই আবার পলাতক। পঞ্চায়েতস্তরে জনপ্রতিনিধিরাও গৃহবন্দি। সব নেতার মধ্যেই এখন ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’র মতো অবস্থা।