অমিত চৌধুরী, তারকেশ্বর: ২০০ বছর আগে মোষ বলি হত ধনেখালির কাঁকড়াখুলি গ্রামের বুড়িমা’র পুজোয়। সেবার পুজোর আগের দিন বলি দেওয়ার জন্য গোয়ালঘরে এনে রাখা হয়েছিল মোষ। আর পাঁচটা গোরুর সঙ্গেই সে বাঁধা অবস্থায় ছিল। রাতে গোরু-মোষের চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায় চৌকিদারের। তিনি গোয়ালঘরে গিয়ে দেখেন, এক শিশুকন্যা মোষের গলা থেকে দড়ি খুলে দিচ্ছে। আর মোষটা গোয়াল ছেড়ে পালাচ্ছে। ওই শিশুকন্যাও এরপর অদৃশ্য হয়ে যায়। চৌকিদার এখবর বাড়ির অন্দরমহলে জানালে গৃহকর্তা বলিপ্রথা বন্ধ করে দেন। এই অলৌকিক ঘটনা থেকে ধারণা করা হয়, মা দুর্গাই শিশুকন্যা রূপে এসে ওই মোষকে মুক্ত করে দিয়েছেন। বর্তমানে পুজোয় ছাঁচিকুমড়ো, আঁখ সহ বিভিন্ন সবজি বলি দেওয়া হয়।
এই পুজো প্রায় ৩৭৫ বছরের পুরানো। পূর্বপুরুষ শ্রীনিবাস কর ধার্মিক মানুষ ছিলেন। সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে পুজো-অর্চনা করতেন। এখানেই রয়েছে প্রায় ৪০০ বছরের পুরানো রাম-সীতার টেরাকোটার মন্দির। শ্রীনিবাসবাবুর গুরুদেব তাঁকে সংসারী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তারপর এই এলাকাতেই বসবাস শুরু করেন তিনি। পরবর্তীকালে তাঁর বংশধর চন্দ্রশেখর কর দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। সকলের কাছে বুড়িমা নামেই পরিচিত এই পুজো।
পরিবারের সদস্য সুরজিৎ ও বিশ্বজিৎ ঘোষ জানান, তালপাতার দুর্গামন্দির থেকে ধীরে ধীরে পাকা মন্দির তৈরি হয়। বর্ধমানের মহারাজের কাছে চাকরি করতেন এই পরিবারের এক সদস্য। দুর্গাপুজোর সময় তিনি ছুটি চাইলে, মহারাজ জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন ছুটি নেবেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, বাড়িতে দুর্গাপুজো আছে। সত্যতা যাচাই করতে মহারাজ হাতির পিঠে চেপে ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে পুজোর সামগ্রী সহ বেশ কিছু জমি-জায়গা দেবীর নামে দিয়েছিলেন তিনি। দেবীকে ঘিরে রয়েছে একাধিক অলৌকিক ঘটনা।
জন্মাষ্টমীতে খড়ের গায়ে মাটি পড়ে। মহালয়ায় শুরু হয় রং। দেবীর রংকে ঘিরেও অলৌকিক কাহিনি রয়েছে। বহু বছর আগে একবার মহালয়ার আগে বাচ্চারা কৌতূহল বসত মৃৎশিল্পীকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ঠাকুর রং করা হবে কবে? উত্তরে মজার ছলে শিল্পী বলেছিলেন, তোদের ঠাকুরের রং নেই কোনো। উনি বিধবা। এরপর দেবীমূর্তিতে তিনি যে রংই করেন না কেন, তা নিমেষে সাদা হয়ে যায়। পরবর্তী সময় স্বপ্নাদেশে মা অসন্তোষের কথা জানালে শিল্পী ক্ষমা প্রার্থনা করে বিশেষ পুজোর আয়োজন করেন। তারপর ফের রং করা হয় প্রতিমায়।
সুরজিৎবাবু বলেন, আমাদের নিজেদের চোখে দেখা, বিসর্জনের পর পরিবারের পুরোহিত হালদার মশাই বার্ধক্যজনিত কারণে শান্তি জল ছেটানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন অন্য একজনকে। রাতে ওই পুরোহিত বাড়ি যাওয়ার সময় হঠাৎই মাঠের মাঝখানে খারাপ হয়ে যায় তাঁর বাইক। অন্ধকার রাতে আকাশ জুড়ে দেখা দেন জাগ্রত বুড়িমা। তিনি কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসেন দেবীর কাছে। ভুল স্বীকার করেন তিনি। এই জাগ্রত দেবীর দর্শনে প্রতি বছর বহু মানুষের ভিড় হয় এই দুর্গা মন্দিরে।



