পশ্চিমবঙ্গে এখনও বিধানসভা ভোটের দিন ঘোষণা হয়নি। কিন্তু বঙ্গ বিজেপিতে সাজো সাজো রব পড়ে গিয়েছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত বাঙালি সমাজে যৌথ পরিবারে বিয়ের মতো কোনো বড়োমাপের সামাজিক অনুষ্ঠান থাকলে বাড়ির লোকেরাই তা উতরে দিতে যাবতীয় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিত। সেদিন আর নেই। এখন বিয়ে মানেই অনেকসময় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থার রমরমা। প্রায় সব দায়িত্ব তারা সামলে দেয় মোটা অর্থের বিনিময়ে। ভোটকে কেন্দ্র করে বাংলায় বিজেপির অবস্থাও অনেকটা তেমনই। দলে হাল ধরার সেরকম কেউ নেই। যাঁরা আছেন, তাঁরাও বহু মত, পথ ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত। অতএব বিভিন্ন সংস্থা ও লোকজন দিয়ে কাজ হাসিল করার চেষ্টা হচ্ছে। যেমন, শাসক দল তৃণমূলের অভিযোগ, ভোটের আগে তড়িঘড়ি এসআইআর করে কোটিখানেক লোকের নাম বাদ দেওয়ার মিশন নিয়ে আদাজল খেয়ে তারা আসরে নেমেছে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে। আবার নির্বাচনের দিন ঘোষণা না হলেও এবার প্রায় নজির ভেঙে ১ মার্চ থেকেই পথে নেমেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। খবরে প্রকাশ, ঘরের কাজ বাইরের লোক দিয়ে করাতে এবার নাকি বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি নেতা-মন্ত্রীরা ঘাঁটি গাড়বেন বাংলায়! রাজ্যের ২৯৪টি কেন্দ্র পিছু তিনজন করে মোট ৮৮২ জন ব্যক্তি দলকে জেতানোর দায়িত্বে থাকবেন। এঁদের জামাই আদরে রাখতে একমাসের খরচ প্রায় ১৮ কোটি টাকা। আবার বিজেপির হয়ে ‘জনমত’ তৈরি করতে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা ‘রিলস’ বানিয়ে বাজারে ছাড়লেই নাকি মিলবে টাকা! শোনা যাচ্ছে, রাজ্যের শাসক তৃণমূলকে টক্কর দিতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথীর পালটা প্রকল্প তৈরি করে লোভনীয় ভোট-প্রতিশ্রুতি সামনে আনতে চাইছে বিজেপি। এর সঙ্গে মোদি-শাহের মতো হেভিওয়েট নেতাদের ‘ডেইলি প্যাসেঞ্জারি’ তো রয়েইছে।
কিন্তু বহিরাগতদের দিয়ে কিছু হাততালি পাওয়া গেলেও যে ‘ম্যাচ’ জেতা যায় না, তা বোঝার জন্য বিশেষ রাজনীতি জানার প্রয়োজন নেই। প্রথমত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিকল্প মুখ’ তো দূরের কথা, এরাজ্যে বিজেপিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রথম সারিতে যাঁরা আছেন, তাঁরা এখনও একসঙ্গে কাজ করার মতো বিশ্বাসযোগ্যতাই তৈরি করতে পারেননি। এঁদের উপর জনগণের তো দূরের কথা, দলের কর্মী-সমর্থকদের কতটা আস্থা আছে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। দ্বিতীয়ত, ভোটে জিততে বুথ স্তরে সংগঠন জরুরি। বঙ্গ বিজেপি যে এক্ষেত্রে প্রায় হামাগুড়ি দিচ্ছে, তাতে সেই দলেরই অনেকের কোনো সন্দেহ নেই। তৃতীয়ত, প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগেই এখন দলের মধ্যে যে বিক্ষোভ বিদ্রোহের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে, তা সামাল দিতেই হয়তো নেতাদের হিমশিম খেতে হবে। চতুর্থত, প্রত্যেক নির্বাচনেই ভোটকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকে। এবার এই বাহিনী আগে এসেছে। কিন্তু তাতে বিজেপির আনন্দিত হওয়ার কোনো কারণ দেখা যাচ্ছে না। পঞ্চমত, এই নির্বাচনে সম্ভবত বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অস্ত্র’ এসআইআর। কিন্তু গত তিনমাসে এসআইআর শুনানির নামে যা চাক্ষুস করেছে বঙ্গবাসী, তারপরে বিজেপির কপালে ‘শনি’ ছাড়া অন্য কিছু নাচার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এসআইআর-এ শুধু সংখ্যালঘু-আদিবাসী নয়, মতুয়াসহ কত সংখ্যক হিন্দু ভোটার বাদ যাচ্ছে— তা ভেবে হয়তো রক্তচাপ চড়তে শুরু করেছে বঙ্গ বিজেপি নেতাদের। জনান্তিকে তাঁদের কেউ কেউ বলতে শুরু করেছেন, ধরে আনতে বলে বেঁধে আনায় জ্ঞানেশ কুমার বাহিনী তৃণমূলের হাতে জয়ের স্মারক তুলে দিল না তো?
বঙ্গ বিজয়ের স্বপ্ন দেখা বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এই বাস্তবতার কথা জানেন না, বোঝেন না— তা নয়। কিন্তু নেতাদের কাজই হল, কোমার পরিস্থিতির থাকলেও শেষমুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচার স্বপ্ন ফেরি করতে হবে। অমিত শাহ ২০২১-এর ভোটের আগে ২০০ আসন দখলের কথা শুনিয়েছিলেন। অথচ দল পেয়েছিল ৭৭টি আসন। এবার তিনি বলেছেন, দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাবে বিজেপি। এসআইআর-এর কল্যাণে তৃণমূলের সঙ্গে মাত্র কয়েক শতাংশ ভোটের ব্যবধান মুছে যাবে— এই আশায় বিজেপি। কিন্তু দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’র ধুয়ো তুলে তৃণমূলের ভোট ব্যাংকে ধস নামানোর ভাবনা শেষপর্যন্ত বুমেরাং হতে পারে। কারণ, এসআইআর-এর বাড়াবাড়িতে হিন্দুদের একটা বড়ো অংশও বিজেপির উপর চটেছে। ইদানীং মূলত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে যেভাবে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্তা করা হয়েছে, কাউকে বা মেরে ফেলা হয়েছে, বাংলায় কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে— তা বিজেপির ভোটব্যাংক আরও নাড়িয়ে দিয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। অতএব ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থার মতো বাইরের শক্তি দিয়ে ভোটে জেতার আশা ছলনা ছাড়া আর কিছুই নয়। চূড়ান্ত ভোটার তালিকার প্রথম পর্ব প্রকাশের পর আর একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, টার্গেট সংখ্যালঘুরাই। তাদের একটা বড়ো অংশের ভোটারকে ‘বিচারাধীন’ বলে দেগে দিয়ে সাইডলাইনের বাইরে রাখার চেষ্টা হয়েছে বলে তৃণমূলের অভিযোগ। যা মানতে নারাজ কমিশন ও বিজেপি। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের প্রচারে নরেন্দ্র মোদি একমুখ দাড়ি নিয়ে মঞ্চে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এবার দেখার, তিনি কোন ‘অবতারে’ অবতীর্ণ হন। বঙ্গবাসীর কিছুটা কৌতূহল থাকছে।