Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অমৃতকথা

কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধ-সম্ভাবনার কথা শুনিয়া রাম বড়ই ব্যথিত হইলেন। কৃষ্ণ বিবাদ মিটাইতে হস্তিনায় গেলেন। রাম ভাবিলেন, এমন বিচক্ষণ ভাই নিশ্চয় বিবাদ-মীমাংসা করিয়া ফিরিবে।

অমৃতকথা
  • ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধ-সম্ভাবনার কথা শুনিয়া রাম বড়ই ব্যথিত হইলেন। কৃষ্ণ বিবাদ মিটাইতে হস্তিনায় গেলেন। রাম ভাবিলেন, এমন বিচক্ষণ ভাই নিশ্চয় বিবাদ-মীমাংসা করিয়া ফিরিবে। কিন্তু দুর্যোধনের যুদ্ধ করিবার সম্পূর্ণ ইচ্ছা, কিছুতেই সে মীমাংসা করিতে সম্মত হইল না। শ্রীকৃষ্ণ বিফলমনোরথ হইয়া ফিরিয়া আসিলেন। দুর্যোধন রামের উপযুক্ত শিষ্য। তাই রাম দুর্যোধনকে বড় ভালবাসিতেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের কথায়ও সে যখন বিরত হইল না, তখন তিনি বড়ই মর্মাহত হইলেন। সম্মুখে থাকিয়া এই আত্মকলহ দর্শন করা তাঁহার পক্ষে অসম্ভব। তাই তিনি তীর্থযাত্রার ছলে দেশত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন। তীর্থদর্শন করিতে করিতে রাম নৈমিষারণ্যে গিয়া উপস্থিত হইলেন। ঋষিরা তথায় এক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছিলেন। সেই উপলক্ষে সূত-জাতীয় ব্যাসশিষ্য রোম-হর্ষণকে ব্যাসের আসনে বসাইয়া তাঁহারা পুরাণ শ্রবণ করিতেছিলেন। রাম তথায় উপস্থিত হইলে মুনিগণ তাঁহাকে যথারীতি অভ্যর্থনা করিলেন, কিন্তু রোমহর্ষণ স্থির হইয়া আসনে বসিয়া রহিলেন। রাম তাঁহার স্পর্ধা দেখিয়া ক্রোধে এক আঘাত করাতে তৎক্ষণাৎ তাঁহার মৃত্যু হইল। ঋষিগণ ‘হায় হায়’ করিয়া উঠিলেন। রাম কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন তাঁহারা বলিলেন যে, ব্যাসের আসনে বসিলে কাহাকেও অভিবাদন করিবার নিয়ম নাই। রাম বড় অনুতপ্ত হইলেন এবং এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে চাহিলেন। মুনিগণ বলিলেন, তাঁহার ব্রহ্মহত্যার পাপ হইয়াছে, ভারতের সমুদয় তীর্থ ভ্রমণই ইহার প্রায়শ্চিত্ত। বিধাতার বিধান লঙ্ঘন করা যায় না। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে যেরূপ অন্যায় নিষ্ঠুরতা হইয়াছিল, বলদেব রাম সেখানে উপস্থিত থাকিলে তাহা হইতে পারিত না। কিন্তু রাজগণের চরিত্র যুদ্ধক্ষেত্রে প্রকাশ না পাইলে মানবজাতির শিক্ষা হইত না, ক্ষত্রিয়গণ যে কত কলুষিত হইয়াছিলেন তাহা বুঝা যাইত না, ভয়ে উভয় পক্ষ যুদ্ধে বিরত হইতেন কিন্তু ভিতরে ভিতরে যত পাপ থাকিয়া যাইত। ভগবানের করুণার অবতার রামের পক্ষে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে যোগ দেওয়া সম্ভব নহে, তাই ভগবান্‌ তাঁহাকে কৌশলে সরাইয়া দিলেন। সমস্ত ভারতের রাজগণ এই যুদ্ধে যোগদান করিবেন এবং এত অল্প দিনে সমস্ত ক্ষত্রিয়কুল নির্মূল হইবে ইহা কেহ ভাবিতেও পারে নাই। বলদেব তীর্থভ্রমণ করিতে লাগিলেন, কিন্তু অল্প দিনেই যুদ্ধ সম্বন্ধে ভয়ানক সংবাদ পাইয়া বিচলিত হইয়া উঠিলেন। একে যুদ্ধের অবস্থা অতি ভীষণ ও বীভৎস, তাহাতে সংবাদ অতিরঞ্জিত হইয়া তাঁহার নিকট পৌঁছিল। প্রভাস তীর্থে যাইতে না যাইতে তিনি শুনিলেন, ক্ষত্রিয়বর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে। এখনও দুর্যোধন জীবিত আছে, নারায়ণী সেনা প্রভৃতি সবই নিহত। আতঙ্কে মন পূর্ণ হইয়া উঠিল, রাম কুরুক্ষেত্রে ছুটিয়া আসিলেন। তখন ভীম ও দুর্যোধনে যুদ্ধ হইতেছে।

Advertisement

কি বিভৎস দৃশ্য! ভীম ও দুর্যোধন হিংসায় পশুর মতন উভয়ে উভয়কে আক্রমণ করিয়াছেন। উভয়েই মরিয়া হইয়া উঠিয়াছেন। দুর্যোধন গদাযুদ্ধে অদ্বিতীয়, ভীম হারিয়া যাইতেছেন এমন সময় ভীম দুর্যোধনের ঊরুতে গদাঘাত করিলে ঊরু ভাঙ্গিয়া গেল, দুর্যোধন মাটিতে পড়িল। ভীম তাহার মাথায় পদাঘাত করিতে লাগিলেন। গদাযুদ্ধে নাভির নীচে আঘাত করিবার নিয়ম ছিল না, পতিত শত্রুকে অপমানিত করা ততোধিক অন্যায়। রাম ক্রোধে অগ্নিবৎ হইয়া লাঙ্গলহস্তে ভীমকে আক্রমণ করিতে ছুটিলেন। কৃষ্ণ তাঁহাকে ধরিয়া নিবারণ করতঃ পূর্বের ঘটনাসমূহ বলিতে লাগিলেন, “এই দুর্যোধন নিজকূলের রমণী রানী দ্রৌপদীকে সভাস্থলে উলঙ্গ করিতে চেষ্টা করে, বারবার তাহার ঊরুতে বসিবার জন্য তাঁহাকে আহ্বান করে, তাই ভীম প্রতিজ্ঞা করেন যে, দুর্যোধনের ঊরু একদিন তিনি ভঙ্গ করিবেন। ঊরুতে আঘাত করিয়া ভীম প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিয়াছেন মাত্র।” আর বলিতে হইল না—রামের সকল কথাই মনে পড়িল। তিনি বুঝিলেন কুরুক্ষেত্রের জটিল ঘটনানিচয়ে শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত অন্যের মতি স্থির রাখা, কর্তব্যনির্ণয় করা অসম্ভব। এই ভীষণ স্থানে ক্ষণকালও থাকিতে তাঁহার ইচ্ছা হইল না। তিনি তৎক্ষণাৎ কুরুক্ষেত্র ত্যাগ করিলেন।
 শ্রীইন্দ্রদয়াল ভট্টাচার্যের ‘দশাবতার চরিত্র’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ