উজ্জ্বল রায়, ধূপগুড়ি: ১৫ আগস্ট দেশজুড়ে যখন সাড়ম্বরে স্বাধীনতা দিবস পালনের প্রস্তুতি চলে, কোথাও মঞ্চ, কোথাও মাইক আবার কোথাও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ব্যস্ততা—ঠিক তখনই ধূপগুড়ির ঐতিহাসিক বিদ্যাশ্রমে দেখা যায় এক ভিন্ন ছবি। সেখানে পতাকার দড়ি হাতে একাকী দাঁড়ান গৌরী ঘোষ। আশপাশে দু-একজন মানুষ থাকলেও, পতাকা তোলার মূল দায়িত্ব থাকে তাঁরই কাঁধে। আর সন্ধ্যা নামলে খাঁ খাঁ করা আশ্রমের ভিতরে পরম যত্নে প্রদীপ জ্বালান তিনি। এক হাতে জাতীয় পতাকা আর অন্য হাতে ইতিহাসের আলো নিয়ে বছরের পর বছর ধরে ধূপগুড়ি বিদ্যাশ্রমের স্মৃতি আগলে রেখেছেন এই বৃদ্ধা। তবে স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে দাঁড়িয়ে গৌরীদেবীর চোখেমুখে এখন শুধুই আশঙ্কার কালো মেঘ। তাঁর একটাই আক্ষেপ, আমি মারা যাওয়ার পর এই আশ্রমের ভিতরে প্রদীপ জ্বালাবে কে?
ধূপগুড়ির প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত এই বিদ্যাশ্রমটি আসলে কোনো সাধারণ পুরনো বাড়ি নয়, এটি স্বাধীনতা সংগ্রামের এক জীবন্ত স্মৃতিচিহ্ন। স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকারীদের গোপন আশ্রয়স্থল হিসাবে এই আখড়া গড়ে তুলেছিলেন বিপ্লবী ধীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত। পরবর্তীতে শান্তিরঞ্জন চক্রবর্তী, রাখালচন্দ্র দে, কুমারেশ ঘোষ, যাত্রামোহন দাস সহ বহু প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী এখানে এসে আত্মগোপন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে রাখালচন্দ্র দে আন্দামান ও কারোয়ার জেলে ইংরেজদের হাতে বন্দিও ছিলেন।
দেশভাগের পর ১৯৫৩ সালে বাংলাদেশের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে ধীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত প্রায় ২০০ বিঘা জমি কিনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। একসময় স্বনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে এখানে পুরোদমে চরকা ও তাঁত চলত। আশ্রমের তৈরি তাঁতের কাপড় নিয়মিত কলকাতার খাদি ভবনেও পাঠানো হতো। লবণ ও কেরোসিন তেল ছাড়া আশ্রমের বাসিন্দাদের বাইরে থেকে কিছুই কিনতে হতো না বলে জানা যায়।
বিপ্লবী কুমারেশ ঘোষের ভাগ্নি গৌরী ঘোষও মামার হাত ধরেই এই আশ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বিএসসি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ শেষ করে সরকারি হাসপাতালে চাকরি করলেও, আশ্রমে আসার পর তিনি আর কলকাতায় ফিরে যাননি। ১৯৮৫ সাল নাগাদ আশ্রম চত্বরে প্রতিষ্ঠিত হরিজন স্কুলে শিক্ষিকার দায়িত্বও নেন তিনি। আজ সেই গৌরবময় আশ্রমের দেওয়ালে দেওয়ালে ফাটল ধরেছে, চারিদিকে চরম ভাঙাচোরা অবস্থা। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ঐতিহাসিক চরকা ও তাঁতঘর সহ নানা মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন।
আশ্রম পরিচালন কমিটির সদস্য সুশীল বৈদ্য বলেন, সরকারি উদ্যোগে অবিলম্বে এই বিপ্লবী ও তাঁদের ঘর সংস্কার করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে তাঁদের ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলো যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তবে এই বিদ্যাশ্রম আগামী দিনে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিকেন্দ্র ও পর্যটনস্থল হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, আশ্রমের এই কঙ্কালসার দশা দেখে ধূপগুড়ির আপামর মানুষের একটাই কথা—বিপ্লবীরা চলে গিয়েছেন, পড়ে আছে শুধু ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের শেষ প্রদীপটি এখনও পরম মমতায় নিজের হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন গৌরীদেবী।
• নিজস্ব চিত্র।