Bartaman Logo
১৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

আকাশের নীচে বিনা পয়সার ‘পাঠশালা’, প্রভাতবাবুর কাছে মিলছে চরিত্র গঠনের পাঠও  

আকাশের নীচে বিনা পয়সার ‘পাঠশালা’, প্রভাতবাবুর কাছে মিলছে চরিত্র গঠনের পাঠও
 
  • ২৮ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
রঞ্জুগোপাল মুখোপাধ্যায়, ফুলবেড়িয়া: জঙ্গল ঘেরা গ্রামে কচিকাঁচাদের পড়াতে গিয়ে কখনও দাঁতাল হাতির তাড়া খেয়েছেন। রাত বিরেতে ছাত্র পড়িয়ে ফেরার পথে হায়না বা বন শুয়োরের সামনেও পড়েছেন। কখনও আবার রাস্তায় আড়াআড়িভাবে পথ আটকেছে মস্ত অজগর! তা সত্ত্বেও উত্তর বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের দুঃস্থ পড়ুয়াদের বিনা পয়সায় টিউশনি পড়ানো থেকে বিরত হননি বেলিয়াতোড়ের যামিনী রায় কলেজের অধ্যাপক প্রভাত কুম্ভকার। বছর চল্লিশের ওই অধ্যাপক গত আট বছর ধরে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করছেন। এমনকী, ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিচ্ছেন ঠাকুর-মা-স্বামীজির বাণী, আদর্শ। 
Advertisement
অকৃতদার প্রভাতবাবু। তিনি যামিনী রায় কলেজের বাংলা বিভাগের আংশিক সময়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি অবশ্য ‘স্টেট এইডেড কলেজ টিচার’ হিসেবে পড়াচ্ছেন। কলেজের সময়টুকু বাদ দিয়ে দিনভর তিনি ছাত্রছাত্রী পড়ান। প্রভাতবাবুর বাড়ি বড়জোড়া ব্লকের খাঁড়ারি অঞ্চলের ফুলবেড়িয়া গ্রামে। ওই এলাকার চারপাশে জঙ্গল রয়েছে। বনদপ্তরের বড়জোড়া ও বেলিয়াতোড় রেঞ্জ এলাকার জঙ্গলগুলির মাঝে ছোট ছোট অনেক গ্রাম রয়েছে। বনশোল, কালপাইনি, শ্যামপুর, হরিশপুর, পাবয়া গ্রামে হাতি সহ অন্যান্য বন্য পশুর উপদ্রব রয়েছে। বর্তমানে পাবয়ার জঙ্গলে ৬২টি হাতির একটি দল ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে। ওই এলাকায় দলছুট রেসিডেন্সিয়াল হাতির দৌরাত্ম্য সারা বছর লেগেই থাকে। ফলে গৃহশিক্ষকতা করতে কেউ ওইসব গ্রামে যান না। হাতির হামলার ভয়ে সকাল-সন্ধ্যায় ছাত্রছাত্রীরা প্রাইভেট টিউশনি পড়তে অন্যত্রও যেতে পারে না। তফসিলি জাতি ও উপজাতি অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে বেশিরভাগই প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। ফলে গ্রামগুলিতে পড়ানোর লোক নেই বললেই চলে। স্কুলের সময়ে ছাত্রছাত্রীরা অভিভাবকদের সঙ্গে দল বেঁধে জঙ্গলপথ পার হয়। কিন্তু, একা টিউশনি পড়তে যাওয়ার ক্ষেত্রে তা কার্যত অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে একমাত্র মুশকিল আসান প্রভাতবাবু। বন্য জন্তুর আক্রমণের ভয় বা শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষার প্রতিকুল আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে তিনি বছরের পর বছর নিরলসভাবে ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান করে চলেছেন। শীতের বিকেলে বনশোল গ্রামে খোলা আকাশের নীচে ‘পাঠশালা’–য় প্রভাতবাবুকে পড়াতে দেখা গেল। পড়া শেষে তিনি ছাত্রছাত্রীদের ব্যায়ামও করান।
প্রভাতবাবু বলেন, ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের ভাবাদর্শে বিশ্বাস করে আমি সমাজসেবা শুরু করি। সেই সূত্রে জঙ্গল ঘেরা গ্রামগুলিতে ঘুরতে গিয়ে শিক্ষার অভাব, কুসংস্কারের রমরমা চোখে পড়ে। এলাকায় বাল্যবিবাহ ও স্কুলছুট হওয়ার প্রবণতা ছিল মারাত্মক। মাঝপথে পড়াশোনা বন্ধ করার অন্যতম প্রধান কারণ হাতির ভয়। তাই আমি গ্রামগুলিতে গিয়ে পড়ানো শুরু করি। পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, শরীরচর্চার পাঠও দিই। প্রাক্তন ছাত্ররাও আমাকে এই কাজে সহযোগিতা করে। বর্তমানে প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণির শতাধিক পড়ুয়া আমার ছত্রছায়ায় থাকে।
ফুলবেড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী বর্ষা রায় বলে, শৈশব থেকেই প্রভাতবাবুর কাছে পড়ছি। পড়াশোনার পাশাপাশি উনি আমাদের জীবন ও চরিত্র গঠনেরও পাঠ দেন।
অভিভাবক টিয়া রায়, রুপালি রায় বলেন, মাস্টার মশাই আমাদের সন্তানদের বিনামূল্যে পড়ান। এমনকী নিজের বেতনের টাকায় ওদের বইখাতাও কিনে দেন। প্রভাতবাবু না থাকলে এতদিনে এলাকার অনেকেরই পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যেত। পড়ানোর শেষে উনি আমাদের ঠাকুর-মা-স্বামীজির বাণী, আদর্শের পাঠ দেন। উনি একজন আদর্শ মাস্টারমশাই।
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ