


বিশেষ নিবন্ধ, সমৃদ্ধ দত্ত: ত্যেকবার ভোটের আগে বিরোধীরা এই একই ফাঁদে পা দেয়। আর ফলপ্রকাশের পর বিস্মিত হয়। প্রত্যেকবার ভোটের আগে বিজেপি রাজনীতির বাইরের কোনো শক্তিকে বেশি নির্ভর করে। ফলপ্রকাশের পর আফশোস করে। প্রত্যেকবার তৃণমূল বিরোধী ভোটাররা মূল ইস্যু থেকে বিভ্রান্ত হয়ে ভাবে ইডি-সিবিআই, নির্বাচন কমিশন আর কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাপট ও অতি সক্রিয়তায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচণ্ড বিপদে পড়েছেন। তিনি ভয় পেয়েছেন, এটা ভাবতে বিরোধীদের ভালো লাগে। আর গোটা ভোটপর্বে সুকৌশলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লাগাতার ইডি-সিবিআই, নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় ফোর্সের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়ে বিক্ষোভ, মিছিল, অবস্থান, ধরনা ইত্যাদি করে বুঝিয়ে দেন তিনি প্রবল ক্ষুব্ধ। বিরোধীরা এই আচরণ দেখে ভাবে মুখ্যমন্ত্রী খাদের কিনারায়। এবার আর নিস্তার নেই। সেই ভুলের ফাঁদে বিরোধীরা পা দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি, প্রকৃত সরকার বিরোধী ইস্যু, প্রচারের অভিমুখ থেকে সম্পূর্ণ সরে যায় নিজেদের অজান্তে। আর ভোটের ফলাফলে দেখা যায় তৃণমূল আরও বেশি আসনে জয় পেয়েছে। বিজেপিকে ভাবতে হবে যে, রাজনৈতিক লড়াই এবং তৃণমূল বিরোধী ইস্যুগুলিকে তারা পর্যাপ্ত মনে করছে না কেন? কেন বারংবার রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন কেন্দ্রীয় এজেন্সি, নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীকেই ত্রাতা হিসেবে মাঠে নামাচ্ছে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব? ১৫ বছর ধরে এই স্ট্র্যাটেজি তো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বাংলায়!
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম নির্বাচন কমিশনের বিরোধ এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, কমিশন খোদ একজন মুখ্যমন্ত্রীর প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। ওই বছরের ১২ এপ্রিল ২৪ ঘণ্টার জন্য কমিশন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর। ওই সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মেয়ো রোডে গান্ধী মূর্তির পাদদেশে ধরনায় বসেন। এবারও সেই একই চিত্র দেখা গিয়েছে ভোট পর্ব শুরুর আগেই। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই ধরনায় বসেছিলেন। ২০২১ সালে নির্বাচন চলাকালীন আইএএস এবং আইপিএস অফিসারদের নির্বাচন কমিশন অপসারণ করে দেয়। মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেছিলেন, কমিশন বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে কাজ করছে।
সেই বছর কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রবল আগমন শুরু হয়। এবং জেলায় জেলায় আধা সামরিক বাহিনী ভোটের আগেই ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিল। বিস্ফোরণ ঘটল কোচবিহারের শীতলকুচিতে।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে চার গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যবাসীকে বলেছিলেন,
কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোট দিতে বাধা দিলে রুখে দাঁড়ান। খবর দেবেন আমাদের পার্টি অফিসগুলিতে, আমরা সঙ্গে সঙ্গে টেক আপ করে পুলিশ গিয়ে আপনাদের বুথে পৌঁছে দিয়ে আসবে। কারও বৈধ ভোট আটকানো যায় না।
২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে সন্দেশখালি ইস্যু বিরাট আকার ধারণ করে। ভোট ছিল এপ্রিল মাসে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহেই
বিপুল কেন্দ্রীয় বাহিনী বাংলায় ঢুকে পড়ে। ১৫০ কোম্পানি। তার মধ্যে শুধু উত্তর ২৪ পরগনায় মোতায়েন করা হয় ২১ কোম্পানি। কারণ সন্দেশখালি। এত আগে থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্য দখল করে নেওয়ার প্রতিবাদ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়। একদিকে যেমন কেন্দ্রীয় বাহিনী, তেমনই আবার গত লোকসভা ভোটে ইডি-সিবিআই প্রবল সক্রিয়তায় নেমে পড়েছিল। রাজ্যে রাজ্যে তারা গ্রেপ্তার করতে শুরু করে। বাংলাও বাদ যায়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি টার্ম ব্যবহার করেছিলেন, সুপার ইমার্জেন্সি। তিনি ইন্ডিয়া জোটকে বলেছিলেন, সম্মিলিত প্রতিবাদ দরকার।
সুতরাং প্রত্যেক ভোটের আগেই বঙ্গ বিজেপি প্রথম দাবি করে যে, সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ভোট করাতে হবে। একটির পর একটি ভোটে
দেখা যায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কমিশনের বিরোধ চূড়ান্ত পর্যায়ে যাচ্ছে। ভোটপর্বে চরম সংঘাত শুরু হয়। স্বাভবিকভাবেই। কারণ রাজ্য সরকারের হাত থেকে সম্পূর্ণ অধিকার কেড়ে নিতে অতি
তৎপরতা দেখায় কমিশন। বিরোধীরা মনে করে এবং প্রচারও করে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব নার্ভাস। একদিকে কমিশন এবং অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ফোর্স। সুতরাং এবার ভোট হবে নিরপেক্ষ, অবাধ ও নির্বিঘ্নে। যখন ভোটপর্ব চলে, তখন এই প্রবল কেন্দ্রীয় কঠোরতার কারণে ভোটে কারচুপি, রিগিং ইত্যাদি অভিযোগ বিজেপি তোলে না। বরং দাবি করে, এবার অভাবনীয় ফলাফল হবে। সরকার গঠন করবে বিজেপি। এমনকি ভোট যেদিন সমাপ্ত হয়, তখনও সাংবাদিকরা প্রশ্ন করে যে, ভোট নিয়ে কোনো অভিযোগ আছে? বিজেপি ও বিরোধীরা বলে, ভোট কমবেশি অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। অথচ ভোটের ফলপ্রকাশের দিন দুপুর না গড়াতেই যখন দেখা যায় বিরোধীদের পরাজয় ঘটছে, তখন থেকে বলা হয়, সঠিক ভোট হলে এই ফলাফল হত না। অপেক্ষা করলে দেখা যাবে অবিকল এই চিত্রনাট্য এবারও অপেক্ষা করছে।
সুতরাং ২০২৬ সালে এই যে নির্বাচন কমিশন অতিরিক্ত সক্রিয়তা দেখাচ্ছে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর সংখ্য এক ধাক্কায় অনেক বাড়ানো হচ্ছে, এসব দেখে বিজেপি ও বিরোধীরা ফের বলতে শুরু করেছে, এবার হবে আসল খেলা। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, এই যে এসআইআর, ভোটার তালিকা, ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যাওয়া, ৬০ লক্ষ বিচারাধীন, প্রতিদিনই জেলাশাসক, এসপি, পুলিশ কর্তাদের পদ থেকে অপসারণ করে দেওয়া, এসব খুব স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূলকে সমস্যায় ফেলার লক্ষ্যে। তৃণমূল এই প্রতিটি পদক্ষেপে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হচ্ছে। কিন্তু এসব তো আগেও হয়েছে। এবং তৃণমূল জয়ী হয়েছে। তাহলে বিজেপি ও বিরোধীরা এত উৎসাহিত হচ্ছে কেন? তারা বরং প্রচারে রাজনীতির ইস্যুতে ঝাঁপিয়ে পড়ুক। এসব কমিশন এজেন্সি নিয়ে ভোটে জেতা যায় না। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের কথা মনে করা যাক। ১৯ এপ্রিল রাজ্য পুলিশের ডিজি পদ
থেকে রাজীবকুমারকে সরিয়ে দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সেই পদে আনা হয়েছিল বিবেক সহায়কে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আবার বদল করে দেওয়া হয়। বিবেক সহায়কে অপসারণ করে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়কে ডিজি করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে কিছু কম ছিল না কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাপট। অমিত শাহ
২০২৪ সালে বলেছিলেন, বিজেপি ৩৫ আসন পাবে। কী ফল হয়েছিল? উলটে বিজেপির লোকসভার আসন এবং ভোট শতাংশ দুইই কমে গিয়েছিল। ২০২১ সালেও তাই। সেই সময় কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি ছিল অতি সক্রিয়। যখন তখন যাকে তাকে জেরা করছে, গ্রেপ্তার করছে, অভিযান চালাচ্ছে। ২০২১ সালে অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন, আব কী বার ২০০ পার। ফলাফল কী হয়েছিল? বিজেপি ৭৭ আসন পেয়েছিল।
সোজা কথায়, বিজেপি তথা বিরোধীদের গেমপ্ল্যানেই গলদ থেকে যাচ্ছে বারংবার। সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা যাচ্ছে যে, কমিশন, এজেন্সি, কেন্দ্রীয় বাহিনী সব নিয়েই বিজেপি ঝাঁপিয়েছে। অর্থাৎ একা নরেন্দ্র মোদির মুখ অথবা ডবল ইঞ্জিনের প্রচার যথেষ্ট বলে বিজেপিই মনে করছে না। সেই কারণেই এই অরাজনৈতিক অস্ত্রকেও দরকার হচ্ছে সবথেকে বেশি করে। এটা দলের ইমেজের জন্য ক্ষতিকর। অজান্তে বিজেপির নেতাকর্মী ও ভোটাররা মনস্তাত্ত্বিকভাবে নির্ভর করছে কমিশন, এজেন্সি, সেন্ট্রাল ফোর্সের উপর। অর্থাৎ এরাই যেন ভোট বৈতরণি পার করিয়ে দেবে। তা কিন্তু হচ্ছে না কোনো বার। অথচ সেই একই প্রবণতা আবার এবং বারবার।
সুতরাং ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী, এসআইআরের মিলিত আক্রমণে এখন থেকেই বিজেপি ধরে নিচ্ছে, এবার জয় নিশ্চিত। বিজেপির প্রচারের অভিমুখ কিন্তু দেখা যাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভয় পেয়েছেন, অনুপ্রবেশকারীদের ভোট আর পড়বে না ভেবে তিনি নাকি দিশাহারা ইত্যাদি। এটা ভুল কৌশল। কারণ, এগুলো যত বিজেপি ভাববে এবং প্রচার করবে, ততই কিন্তু জনমনে এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা হবে যে, তাহলে তো এবার ভোটে কোনো অনিয়ম হবে না। কারচুপি হয়নি। কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া প্রহরায় ভোট হয়েছে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ।
সমস্যা হল, তারপরও যদি দেখা যায় ৪ মে তৃণমূল জয়ী হয়ে গিয়েছে, তাহলে বিজেপির কাছে আর কোন ইস্যু পড়ে থাকবে ভবিষ্যতের
রাজনীতির জন্য? এসআইআর নিয়ে কমিশন অতিরিক্ত যথেচ্ছাচার করে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, অনুপ্রবেশকারী বলে আর কিছু নেই ভোটার তালিকায়। সুতরাং সব ভোট বৈধ। কিন্তু তা সত্ত্বেও যদি বিজেপি পরাজিত হয়? তখন কৈফিয়ত কী হবে? তাই কমিশনের অতি তৎপরতা, কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাপট সবই কিন্তু আসলে যতটা তৃণমূলকে বিপদে ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে, ঠিক ততটাই পরোক্ষে বিজেপির জন্যও চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। কারণ, এতকিছুর পরও যদি তারা ব্যর্থই থেকে যায়, তাহলে জবাব কী দেবে তারা?