


নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: নিকাশি নালা থেকে যানজট, শহরে চুরি ছিনতাই থেকে ফুটপাত দখল— নাগরিক যন্ত্রণার ফিরিস্তি দীর্ঘ। গত কয়েক বছরে সিউড়ির সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভের বাষ্প জমা হয়েছে, তা আর অজানা নেই পুর-কর্তৃপক্ষের। এই প্রেক্ষাপটেই বিধানসভা নির্বাচনের আগে এক ‘অপ্রত্যাশিত’ চাল দিলেন সিউড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিউড়ির এক বেসরকারি হোটেলে শহরের ডাক্তার, শিক্ষক, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিশিষ্টজনদের নিয়ে বৈঠক করেন তিনি। নাগরিকদের সামনেই কার্যত স্বীকার করে নিলেন— শহরের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সৌন্দর্যায়নের জন্য অনেক কাজ করার চেষ্টা করেছেন তিনি। নাগরিকদের অনেক সমস্যার সমাধান করতে পেরেছেন। কিছু ক্ষেত্রে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, এই ‘ভুল স্বীকার’ কি নিছকই সচেতন নাগরিক বোধ থেকে, না কি এর নেপথ্যে রয়েছে বিধানসভার টিকিটের সমীকরণ?
বিশিষ্টজনদের নিয়ে ওই বৈঠকের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘আমাদের শহর, আমাদের প্রশ্ন’। সেখানে উপস্থিত বাসিন্দারা কার্যত ক্ষোভের ঝুলি উজাড় করে দেন। কারও অভিযোগ, শহরে ‘পাতাখোর’ বা মাদকাসক্তদের দাপট বাড়ায় চুরি-ছিনতাই রোজকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারও প্রশ্ন, প্লাস্টিকের দাপটে নিকাশি নালা বুজে বর্ষায় শহর কেন জলমগ্ন হচ্ছে? আবার কেউ বিঁধেছেন ফুটপাত দখল আর টোটোর যন্ত্রণাকে। রাতের অন্ধকারে বালির গাড়ির দাপটে শহরের রাস্তার কঙ্কালসার চেহারা নিয়েও সরব হন বিশিষ্টরা। সিউড়ি স্টেশনে পর্যাপ্ত ট্রেনের অভাব কিংবা দাপুটে বাইকারদের দৌরাত্ম্য নিয়েও অভিযোগ ওঠে। তবে শুধু অভিযোগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি আলোচনা। উপস্থিত বিশিষ্ট নাগরিকরা স্পষ্টই জানান, শহর নোংরা করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অব্যবস্থার পিছনে বাসিন্দাদের সচেতনতার অভাবও সমানভাবে দায়ী। তাঁদের কথায়, শহরের মানুষকে নিয়ে মাঝে মধ্যেই এমন বৈঠক হওয়া প্রয়োজন। আমাদের অনেক বাসিন্দার মধ্যেই সিভিক সেন্স বা নাগরিক সচেতনতা নেই। নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার পাঠ দেওয়া দরকার।
বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপচরিতায় পুরপ্রধান নিজের ব্যর্থতা মেনে নিয়ে স্পষ্ট জানান, এতদিন যে সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারেননি, সেগুলি সমাধানে যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন তিনি। একই সঙ্গে প্রশাসনিক অসহযোগিতার দিকেও প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। শহরবাসীর অন্যতম প্রধান সমস্যা ফুটপাত দখল বা টোটো নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, কারও পেটে লাথি মারা ঠিক হবে না। তবে লাগাম টানা প্রয়োজন। সেই পদক্ষেপ শীঘ্রই করা হবে। এমনকী নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে ‘হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ’ করারও পরামর্শ দিয়েছেন পুরপ্রধান।
ভোটের আগে হঠাৎ এই ‘জনসংযোগ’ নিয়ে বীরভূমের রাজনৈতিক অন্দরে শুরু হয়েছে জোর গুঞ্জন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামনেই নির্বাচন। তার আগে আচমকা এই ‘আত্ম সমালোচনা’ এবং বিশিষ্টজনদের সঙ্গে সখ্যতা তৈরির নেপথ্যে গভীর রাজনৈতিক অঙ্ক রয়েছে। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, ফের নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার লড়াইয়ে নিজেকে এগিয়ে রাখতেই চেয়ারম্যান এই পথ বেছে নিয়েছেন। দলের শীর্ষ মহলের পরামর্শেই নিজেকে আরও ‘স্বচ্ছ’ এবং ‘নমনীয়’ প্রমাণ করতে উদ্যোগী হয়েছেন। চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ মহলে অবশ্যদাবি, দাবি, এটি নিছকই উন্নয়নের স্বার্থে একটি অরাজনৈতিক আলোচনা। তবে বিরোধীদের কটাক্ষ, পায়ের তলার মাটি সরছে বুঝেই এখন উন্নয়নের ফিরিস্তি আর আত্ম সমালোচনার নাটক করছেন পুরপ্রধান। সিউড়ির এই চা-চক্র শেষ পর্যন্ত বিধানসভার বৈতরণী পার করতে তৃণমূলকে কতটা সাহায্য করে, সেটাই এখন দেখার।