নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: প্রশাসনের একের পর এক দরজায় কড়া নেড়েও লাভ হয়নি। হাওড়া পুরসভা, জেলাশাসক, সাংসদ, এমনকি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরেও পৌঁছেছে অভিযোগ। তবু বদলায়নি ছবিটা। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন মধ্য হাওড়ার পঞ্চাননতলার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। গত ২১ মে স্থানীয় বাসিন্দা পার্থ ঘোষ সহ ছ’জন জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর জমা জলের যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, বহু পরিবার বাধ্য হয়ে পৈতৃক বাড়ি বিক্রি করে এলাকা ছাড়ছেন। শিশুদের স্কুলে যাওয়া কার্যত বন্ধ, প্রবীণরা গৃহবন্দি, আর ঘরে ঘরে বাড়ছে পায়ের সংক্রমণ।
এই দুর্ভোগের কেন্দ্রবিন্দু ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাতকড়ি চ্যাটার্জি লেন, নীলমণি মল্লিক লেন এবং মধুসূদন বিশ্বাস লেন। ভোগান্তি নতুন নয়, বহু বছরের। তবে গত বছর পুজোর আগে পঞ্চাননতলা রোড সংস্কারের সময় রাস্তার উচ্চতা অনেকটাই বাড়িয়ে দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে বলে অভিযোগ। গোটা এলাকা নিচু হয়ে যাওয়ায় এখন বৃষ্টি না হলেও দিনের পর দিন প্রায় সমস্ত অলিগলিতে জল দাঁড়িয়ে থাকে। সেই জল জমে থাকে প্রায় প্রতিটি বাড়ির একতলায়। তার উপর নালা সাফাইয়ের কাজ কার্যত বন্ধ। বাসিন্দাদের অভিযোগ, সমস্যা শুধু জল জমায় সীমাবদ্ধ নয়। পঞ্চাননতলা এলাকায় শতাধিক ধাতব কারখানা রয়েছে। সেখান থেকে বেআইনিভাবে নিকাশিনালায় অ্যাসিড ফেলা হয়। সেই অ্যাসিড জমা জলের সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে পড়ছে অলিগলিতে। তার জেরেই বহু মানুষ পায়ে সংক্রমণ ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাঁদেরই একজন তন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘এই নোংরা, অ্যাসিড মেশানো জলের মধ্যে আর থাকা যাচ্ছে না। পায়ে ভীষণ জ্বালা। এখন ডাক্তার দেখাচ্ছি।’
সমস্যা বাড়িয়েছে পাম্পের বেহাল অবস্থা। স্থানীয় রবীন সংঘের পাশে ২০১৭ সালে বসানো পাম্পটি দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঠিকমতো কাজ করে না বলে অভিযোগ। ফলে শুধু ১৯ নম্বর ওয়ার্ড নয়, ১৭, ১৮, ২৭ ও ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের জল ও জলে ভাসতে থাকা আবর্জনা এসে জমা হয় এখানেই। হাওড়া পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, পঞ্চাননতলা এলাকায় জমা জলের সমস্যা মেটাতে ইতিপূর্বে নীলমণি মল্লিক লেনে নতুন একটি পাম্প হাউস তৈরির অর্ডার হয়েছিল। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও কেন কাজ হয়নি, তা অজানা। প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার পরিবারের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে ২০২২ সালের আগস্টে পুরসভায় গণস্বাক্ষর সহ স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। এরপর একে একে চিঠি দেওয়া হয় প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে। গত এপ্রিল মাসেও ফের আবেদন করেন বাসিন্দারা। অভিযোগ, চার বছরেও পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দা পীযূষ মুখোপাধ্যায়ের আক্ষেপ, বর্ষার সময় এই জমা জল কতটা অস্বাস্থ্যকর ও বিষাক্ত হয়ে ওঠে, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন। তাই এবার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি আমরা।