


বিশেষ নিবন্ধ, সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: রাত পোহালেই বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফা। তার আগে এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলা। একদিকে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপির সর্বাত্মক প্রচার। অন্যদিকে টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেসের ‘চতুর্থ ইনিংস’ শুরু করার প্রস্তুতি। তবে অন্যবারের নির্বাচনি যুদ্ধের তুলনায় এবারের লড়াই শাসক শিবিরের কাছে একটু আলাদা। একটু বেশি চ্যালেঞ্জিং। কারণ দলের সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে টিম তৃণমূল নেমেছে এক অদৃশ্য যুদ্ধে। ‘মিশন ২৫০’। এই লক্ষ্যমাত্রা অবশ্য চায়ের আড্ডা বা কোনো মনগড়া আলোচনায় ঠিক করেননি এবি (দলীয় কর্মীদের কাছে নাম ও পদবির এই দুই আদ্যক্ষরেই বেশি পরিচিত অভিষেক)। তাঁর এই লক্ষ্যমাত্রার নেপথ্যে রয়েছে শুধুই সংখ্যাতত্ত্ব। নির্বাচনি রণকৌশল নির্মাতাদের ভাষায়, ‘ডেটা অ্যানালিটিক্স’।
প্রার্থী তালিকা ঘোষণার সময়েই দলের জয়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে দিয়েছেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জানিয়ে দিয়েছেন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ২২৬টির বেশি আসনে জিতবে জোড়াফুল। এরপর বিভিন্ন নির্বাচনি জনসভায় তৃণমূল সুপ্রিমোর মুখে শোনা গিয়েছে ২২৬ আসনের কথা। কিন্তু দলের অন্দরমহলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ, ‘২২৬ নয়, টার্গেট ২৫০’। কিন্তু কীভাবে এত সংখ্যক আসন জিতবে তৃণমূল?
বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের নিত্যনতুন তুঘলকি সিদ্ধান্তের সঙ্গে লড়াই করে ২৫০ আসন জয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়া যে সহজ কাজ নয়, তা বিলক্ষণ জানে ঘাসফুল শিবিরের সেনাপতি। তৃণমূলের রণকৌশলে এবার সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বুথ স্তরের তথ্য বিশ্লেষণে। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ২১৩টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল। সেই নির্বাচন ও গত লোকসভা ভোটের ফলাফলের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। টার্গেট পূরণে গত লোকসভা ভোটে তৃণমূল যে ২৯টি কেন্দ্রে জিতেছিল, তার অন্তর্গত ৩০-৩৫টি বিধানসভা আসনের উপর বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। ‘পাখির চোখ’ অবশ্য ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কম ব্যবধানে জেতা আসনগুলি। গত বিধানসভা ভোটে যে ১০০টিরও বেশি আসনে ১৫,০০০ ভোটের কম ব্যবধানে জয় এসেছিল, সেই আসনগুলিকে রাখা হয়েছে ‘হাই-অ্যালার্ট’ জোনে। এরপর রয়েছে ‘ক্লোজ কনটেস্ট পকেটস’ আসনগুলি। ২০২১ সালে ৩৪টি আসনে জয়ের ব্যবধান ছিল ৫,০০০ ভোটের নীচে। তার মধ্যে বিজেপি জিতেছিল ২১টি এবং তৃণমূল ১৩টি। তার মধ্যে রয়েছে পুরুলিয়া জেলার বলরামপুর থেকে কোচবিহার দক্ষিণ কেন্দ্র। আবার ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট, হুগলি জেলার আরামবাগ ও বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর আসনের মার্জিনও ছিল ১০ হাজারের নীচে। ‘মিশন ২৫০’ সফল করতে এই ‘ক্লোজ কনটেস্ট পকেটস’ আসনগুলি নিজেদের ঝুলিতে আনাই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল চ্যালেঞ্জ। আর এই পর্বে তাই কংগ্রেসের একা লড়ার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বাম-আইএসএফ জোটের সমীকরণও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এবারের ভোটে বামপন্থীরা কংগ্রেসের হাত ছাড়লেও আইএসএফের সঙ্গে জোট বজায় রেখেছে। ফলে অধিকাংশ আসনেই লড়াই চতুর্মুখী। বামেদের থেকে মুখ ফেরানো অংশ কতটা লাল পতাকায় ফিরবে, কংগ্রেস কত ভোট পাবে, আইএসএফ সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসিয়ে কোন দলকে শেষ পর্যন্ত সুবিধা করে দেবে, তা নিয়েও চলছে অঙ্ক কষা।
গত বিধানসভা ও লোকসভার নিরিখে নির্দিষ্ট কিছু আসন ও সেই সমস্ত সিটে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান খতিয়ে দেখার পরের ধাপেই রয়েছে ‘এসআইআর এফেক্ট’। বলতে দ্বিধা নেই, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড়ো ফ্যাক্টর ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা ‘এসআইআর’। নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে অন্তত ৪৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে এমন সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যা ২০২১ সালের জয়ের ব্যবধানকেও ছাপিয়ে যায়। এই কেন্দ্রগুলির মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ২৪ এবং বিজেপি ২০ আসনে জয়লাভ করেছিল। মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ কেন্দ্রের কথাই ধরা যাক। এই আসনটিতে তৃণমূল কংগ্রেস ২৬,৩৭৯ ভোটে জয়ী হয়েছিল। এবারে এসআইআরের ফলে সেখানকার ভোটার তালিকা থেকে ৭৪ হাজারের বেশি নাম বাদ পড়েছে। আবার বলরামপুর আসনে বিজেপি মাত্র ৪২৩ ভোটে জিতেছিল। সেখানে ১ হাজারের বেশি নাম কাটা পড়েছে। তালিকায় রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মতুয়া অধ্যুষিত গাইঘাটা, বাগদা কেন্দ্রও। দু’টি আসনেই ২০২১ সালে জয়ের ব্যবধানের তুলনায় এবারে বেশি সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। গত নির্বাচনে অন্তত ৩৩টি আসনে জয়ের ব্যবধান ছিল ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ ভোটের মধ্যে। তার মধ্যে তৃণমূল জিতেছিল ২৪টিতে। অন্যদিকে বিজেপি পেয়েছিল ন’টি। সেই সমস্ত আসনের মধ্যে পটাশপুর, পাঁশকুড়া পূর্ব, সবং, সপ্তগ্রাম, কৃষ্ণনগর দক্ষিণ এবং বারাকপুরের মতো আসনে প্রচুর সংখ্যক নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তৃণমূলের রণকৌশল হল—যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের বাড়িতে সরাসরি পৌঁছে গিয়ে সাহায্য করা এবং এই গোটা বিষয়টিকে ‘বাঙালির ভোটাধিকার হরণের চক্রান্ত’ হিসাবে তুলে ধরে রাজনৈতিকভাবে প্রচার করা।
অঙ্কটা স্পষ্ট। এসআইআরের ফলে বঙ্গে প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। তার মধ্যে এমন বহু বাড়ি রয়েছে, যেখানে পরিবারের অন্য সদস্যদের নাম থাকলেও এক-দু’জনের নাম বাদ পড়েছে। এই ধরনের ঘটনায় গোটা পরিবারই কমিশন ও বিজেপির উপর বেজায় খাপ্পা। তাঁদের রাগ যাতে ইভিএমে প্রতিফলিত হয়, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে টিম তৃণমূলের সদস্যদের। বিষয়টি ভাবাচ্ছে বিজেপিকেও। উত্তরপ্রদেশ, বিহার থেকে আসা নেতারা ঘনিষ্ঠমহলে বলতে বাধ্য হচ্ছেন, ভোটারদের এই অংশ নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে, বোঝা যাচ্ছে না। তেমন হলে বিজেপির আসন ৫০-এরও নীচে নেমে যেতে পারে।
এখানেই শেষ নয়। নির্বাচনি প্রচারে এক অভিনব পন্থা নিয়েছে টিম অভিষেক। সমীক্ষক সংস্থা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জনতার দরবারে পেশ করার আগে তার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে সাংস্কৃতিক বার্তা। এসআইআরের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভোটার ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের নিয়ে তৈরি করা হয়েছে একাধিক ‘কেস স্টাডি’। সেই সমস্ত দৃষ্টান্তমূলক ঘটনাগুলিকে সাজানো হয়েছে ‘বাঙালি অস্মিতা’র আখ্যানের মধ্যে দিয়ে। কৃষক, নারী, প্রবীণ ভোটার এবং তফসিলি জাতি-উপজাতি সম্প্রদায়ের জন্য নেওয়া হয়েছে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি। আর তা প্রচার করার জন্য তৈরি করা হয়েছে আলাদা আলাদা দল।
ভোটপ্রচারের চিরাচরিত প্রথাগত পদ্ধতিতেও এসেছে বদল। আগের সমস্ত নির্বাচনের নিরিখে এবারে ঘাসফুল শিবিরের প্রচারের স্টাইল একেবারেই আলাদা। এতদিন পর্যন্ত সমস্ত ভোটে তৃণমূলের প্রচার অভিযান ছিল মূলত নেতৃত্ব নির্ভরশীল। এবারে আর শুধু নেতৃত্বের ‘ক্যারিশমা’য় আটকে না থেকে ‘বুথ-স্তরের জনসংযোগ’কে মূল অস্ত্র করেছে তারা। ভোটের ঢাকে কাঠি পড়ার পর থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক কেন্দ্রের প্রার্থীদের নিয়ে প্রতিদিন গড়ে তিন-চারটি জনসভা করছেন মমতা ও অভিষেক। কখনো কখনো প্রয়োজন বা গুরুত্ব বুঝে নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীর হয়ে প্রচারে যাচ্ছেন ‘স্টার ক্যাম্পেইনার’রাও। সঙ্গে চলছে নিবিড় তৃণমূল স্তরের জনসংযোগ কর্মসূচি। যার অংশ হিসাবে প্রতি বুথে সপ্তাহে দু’-তিনটি ‘মাইক্রো মিটিং’ করা হচ্ছে। প্রতিটি মিটিংয়ে অংশ নিচ্ছেন ২৫০ থেকে ৩০০ জন স্থানীয় বাসিন্দা। পাশাপাশি চলছে ছোটো ছোটো সভা, পাড়া বৈঠক। টিম এবি’র মতে, এই প্রচার কৌশল আসলে বুথ স্তরের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’।
এই ‘লোকাল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ যে কলকাতা বা জেলা সদর থেকে পরিচালিত করা সম্ভব নয়, শুরু থেকেই তা জানতেন তৃণমূলের রণাঙ্গনের সেনাপতি। আর সেই কারণেই কলকাতায় সেন্ট্রাল কমান্ডের পাশাপাশি রাজ্যের ২৯৪ বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিটিতে আলাদা করে তৈরি করা হয়েছে ‘ওয়ার রুম’। এই প্রতিটি ‘ওয়ার রুমে’র দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ২০ জনের কো-অর্ডিনেটর ও ডেটা এন্ট্রি অপারেটর টিম। নিয়োগ করা হয়েছে প্রায় ১ লক্ষেরও বেশি ‘শ্যাডো এজেন্ট’কে। কী কাজ তাঁদের? ‘শ্যাডো এজেন্টে’র মূল কাজ বুথ লেভেল অফিসারদের (বিএলও) গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং ভোটার তালিকায় কোনো পরিবর্তন আসছে কি না, তা নজরে রাখা। পাশাপাশি, জনসভা থেকে শুরু করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার বা এসআইআর সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ সঠিক জায়গায় করা হচ্ছে কি না, সেগুলি দেখা ও রিয়েল-টাইমে সবকিছু উপরমহলে জানানোর ভারও রয়েছে এঁদের উপর। এছাড়াও দলীয় নেতা-কর্মীরা চায়ের দোকান, বাজার বা আবাসনগুলির বাসিন্দাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে প্রার্থী ও দলের উন্নয়নমূলক কর্মসূচির প্রচার করছে কি না, তার উপরেও নজর রয়েছে ‘শ্যাডো এজেন্ট’দের।
অভিষেকের হাত ধরে বদলেছে প্রচারের ভাষাও। শুধুই তথ্যের কচকচি নয়, হালকা মেজাজে মানুষের মনে বিজেপির বিপদকে গেঁথে দিতে বাংলার লোক সংস্কৃতিকে হাতিয়ার করেছে তৃণমূল। সরকারের কাজের খতিয়ান বা ‘রিপোর্ট কার্ড’ পেশ করা হচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘পাঁচালি’ ফরম্যাটে। এছাড়াও ‘সাপ-লুডো’র বোর্ডের মধ্যে দিয়ে তৃণমূলের ‘১০ অঙ্গীকার’-কে উন্নয়নের মই ও বিরোধীদের বাধাকে সাপের মুখ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যার মূল উদ্দেশ্য একটাই— জটিল রাজনৈতিক তথ্যকে সহজ করে আমজনতার দরবারে পেশ করা।
এবারের ভোটে তৃণমূলের মূল শক্তি হল একাধিক জনকল্যাণমুখী প্রকল্প। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা ১০০০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০০ টাকা করা (তফসিলি জাতি-উপজাতিদের ক্ষেত্রে ১৭০০), বেকারদের জন্য ‘যুবসাথী’ প্রকল্প (১৫০০ টাকা মাসিক ভাতা) অথবা সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত—এই সবক’টি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ভোটারদের বিভিন্ন অংশকে (নারী, যুবক, সরকারি কর্মী) নজরে রেখেই। আবার রাজ্যের যে সমস্ত তফসিলি জাতি ও উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় গতবার বিজেপি ভালো ফল করেছিল, সেখানে সরাসরি সরকারি সুবিধা পৌঁছে দিয়ে হারানো জমি ফিরে পেতেও বাড়তি জোর দেওয়া হচ্ছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মিশন ২৫০’ আসলে এক ধরনের ‘হাই-টেক পলিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং বাঙালি আবেগ, অন্যদিকে অভিষেকের তথ্যনির্ভর বুথ ম্যানেজমেন্ট—এই দুইয়ের মিশেলেই লুকিয়ে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের ২৫০ আসনের লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়ার চাবিকাঠি।