সোমনাথ বসু: মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে বাহারি আলোর রোশনাই। লেজার শো’কে অত্যাধুনিক বললেও কম বলা হবে। বিশাল জায়ান্ট স্ক্রিনগুলি যেন এই মুহূর্তেরই অপেক্ষায় ছিল। গ্যালারিতে হাজির সমর্থকদের উৎসাহ যেন আকাশ ছুঁতে চায়। কাতারের লুসেইল থেকে মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা— সাড়ে তিন বছরের বিরতির পর আবার বিশ্বকাপের বোধন। এরইমধ্যে মঞ্চ মাতাতে হাজির এক এবং অদ্বিতীয় শাকিরা। ঝলমলে বাহারি পোশাকে তিনি মোহময়ী। বার্না বয়ের সঙ্গে গেয়ে উঠলেন বিশ্বকাপের থিম সং, ‘দাই, দাই’। গোটা শরীর দুলছে ৫০ ছুঁইছুঁই পপ সম্রাজ্ঞীর। মাথা, কোমর, দুই পায়ে যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের ছোঁয়া। তাঁর নাচ মুহূর্তে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ল ফুটবল অনুরাগীদের মধ্যে। আলো-আঁধারির মায়াবি পরিবেশে অতুলনীয়া শাকিরা। যোগ্য সঙ্গতে বার্না বয়। গ্র্যামি পুরস্কার জয়ী মেক্সিকান পপ ব্র্যান্ড মানা’ও দেশের মাটিতে গাইলেন ‘ওয়ে মি আমোরে’। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের বোধন একশোয় একশো।
‘দাই দাই’ গানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, ‘কাম ফলো ইওর ডিজায়ার/হোয়েন দেয়ার ইজ আ উইল, দেয়ার ইজ আ ওয়ে...’। আর এটাই যেন হয়েছে ব্র্যাঙ্কোর সঙ্গে। রাতে ভালো ঘুম হয়নি তাঁর। হওয়ার কথাও নয়। সকাল হলেই যে স্বপ্নপূরণ। অনেক কষ্টে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে মাতৃভূমি মেক্সিকোর ম্যাচ দেখার টিকিট পেয়েছে সে। উপরি পাওনা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শাকিরার পারফরম্যান্স। ২০১০’এ টিভির পর্দায় সেই প্রথম কলম্বিয়ান গায়িকার প্রেমে পড়া। ‘ওয়াকা ওয়াকা’ এখনও তাঁর রিংটোন। এতদিন মুঠোফোনের স্ক্রিনে শাকিরাকে দেখা, শোনা। এবার আমনে-সামনে। ব্র্যাঙ্কোর মতো ফুটবলপাগলদের জন্যই কমছে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল। মূলত শিক্ষা সংস্কার, শিক্ষক ও অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন ও বেতন বৃদ্ধির জন্য সরব হয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু ফুটবল জ্বরে আক্রান্তদের জন্য তা অনেকটাই স্তিমিত।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মেক্সিকো সিটির সব রাস্তা মিশেছে স্টেডিও অ্যাজটেকায়। রামধনুর সাত রঙে সেজে উঠেছে শহর। বিশ্বকাপের ট্রফি, লোগো, ম্যাসকটের বিরাট কাট-আউটের সামনে সমর্থকদের সেলফি তোলার হিড়িক। তড়িঘড়ি ব্রেকফাস্ট সেরে ফুটবলপ্রেমীরা বেরিয়ে পড়েছেন। গায়ে প্রিয় দলের জার্সি, গলায় স্কার্ফ। কেউ কেউ স্টেডিয়ামের সামনে ড্রাম বাজাতে ব্যস্ত। গাড়ির বহর সামলাতে হিমশিম পুলিশ প্রশাসন। ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফানতিনো স্টেডিয়ামে ঢোকার সময় নিরাপত্তার ঘেরাটোপ চোখে পড়ার মতো। আসলে ফুটবলের মহাযজ্ঞে ফাঁক রাখতে চাইছে না কেউই। এই প্রথম তিনটি দেশে ভিন্ন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। তবে বৃহস্পতিবার শুধুমাত্র মেক্সিকো সিটিতেই। টরন্টো মাতবে শুক্রবার রাতে (ভারতীয় সময় রাত ১১টা)। আর লস এঞ্জেলসে কেটি পেরিদের দামামা বাজবে শনিবার ভোরে (ভারতীয় সময় ভোর ৫টা)।
মেক্সিকোর ঘড়িতে যখন সকাল ১১টা, কলকাতায় তখন রাত সাড়ে দশটা। তড়িঘড়ি ডিনার সেরে কল্লোল-শোভনরা টিভির সামনে। কেউ আবার চোখ রেখেছেন মুঠোফোনের স্ক্রিনে। মোহন বাগান-ইস্ট বেঙ্গল দূরে সরিয়ে এখন বাঙালি ব্রাজিল-আর্জেন্তিনার জন্য গলা ফাটাবে।
ফুটবল বিশ্বকাপ সবসময়েই ভেরি ভেরি স্পেশাল। আবেগের বিস্ফোরণ মেক্সিকো থেকে মহানগর কলকাতায়। আগামী ৪০দিন এভাবেই কাটবে বাঙালির। রাত জাগা, ভোরে ওঠাই হয়ে উঠবে অভ্যাস। তারপর তো চায়ের ঠেকে মেসি-রোনাল্ডা-নেইমার-এমবাপে নিয়ে চর্চা তো রয়েইছে। সকাল হলেই হাতে খবরের কাগজ নিয়ে চলবে তর্ক-বিতর্ক। দিন এগনোর সঙ্গে সঙ্গে যা ক্রমশ বাড়বে। সেটাই স্বাভাবিক। ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি...’ ফুটবলই যে।