বিধান গঙ্গোপাধ্যায়, দুর্গাপুর: নদীকে যে ভালোবাসে, নদীও তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে, আবার নদীই একদিন সব কেড়ে নেয়- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে কুবের মাঝির জীবনসংগ্রাম যেন আজও বাংলার প্রতিটি নদীপাড়ের মানুষের গল্প। সেখানে যেমন নদী ছিল জীবন-জীবিকার একমাত্র ভরসা, তেমনই ছিল অনিশ্চয়তারও প্রতীক। পদ্মার সেই কুবেরের জীবন যেন আজও বেঁচে আছে দামোদরের বুকে। নদীর নাম বদলেছে, কিন্তু মাঝির ভাগ্য বদলায়নি।
ভোরের প্রথম আলো তখনো পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। দুর্গাপুর পুরসভার ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের আশিসনগরের দামোদরের বেলতলার ঘাটে একে একে জড়ো হচ্ছেন মৎস্যজীবীরা। কারও হাতে জাল, কেউ নৌকার দড়ি গুছিয়ে নিচ্ছেন, কেউ আবার আগের দিনের ছিঁড়ে যাওয়া জাল সেলাইয়ে ব্যস্ত। নদীর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন, আজ জালে মাছ উঠবে তো? নদীর বুক চিরে ছোটো ছোটো নৌকা এগিয়ে যায় জীবিকার সন্ধানে। কিন্তু দিনের শেষে কত মাছ উঠবে, সংসারে হাঁড়ি চড়বে কি না, সেই উত্তর লুকিয়ে থাকে দামোদরের স্রোতের মধ্যেই।
জাল কাঁধে নদীতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নিমাই হালদার। কথা বলতে বলতেই চোখ চলে যাচ্ছিল নদীর দিকে। তিনি বললেন, ছোটবেলা থেকেই দামোদরে মাছ ধরছেন। আজও রুই, কাতলা, পুঁটি-সহ নানা মাছ ওঠে। সেই মাছ আড়তে পাইকারি দরে বিক্রি করেই সংসার চলে। কিন্তু এত বছরেও সরকারি কোনো সাহায্য মেলেনি। তাঁর দাবি, আধুনিক জাল, নৌকা কিংবা মাছ ধরার সরঞ্জাম কেনার জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলে বহু মৎস্যজীবী উপকৃত হবেন।
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন নারায়ণ বিশ্বাস। মুখে চাপা হতাশা। জানালেন, বহুবার আবেদন করেও কোনো সরকারি সুবিধা পাননি। অন্তত জাল ও সুতো কিনতে যদি সরকার কিছু সাহায্য করত, তাহলে অনেকটাই স্বস্তি মিলত। এদিকে নদীর ধারে নৌকার পাশে বসে পুরনো জাল গুছিয়ে রাখছিলেন কানাই হালদার। তিনি বললেন, তাঁদের বাপ-ঠাকুরদারাও এই নদীতেই মাছ ধরে সংসার চালিয়েছেন। এখন সেই পেশাই আঁকড়ে বেঁচে আছেন তাঁরা। কিন্তু আগের মতো আর মাছ ওঠে না। নতুন নৌকা বানাতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাগে, অথচ তিন-চার বছরের মধ্যেই তা নষ্ট হয়ে যায়। নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমেছে। কোথাও কোথাও অবৈধ বালি তোলার অভিযোগও তুললেন তিনি। একইসঙ্গে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবিও জানালেন।
কিছুটা দূরে বসে মন দিয়ে ছেঁড়া জাল সেলাই করছিলেন ভরত হালদার। জালের ফাঁস গাঁথতে গাঁথতেই আঙুল তুলে দেখালেন নদীর দিকে। বললেন, একসময় ওই ঘাটে দু’টি বিশাল বেলগাছ ছিল। সেই থেকেই নাম হয়েছিল বেলতলার ঘাট। আজ সেই গাছ নেই, নদী গিলে খেয়েছে। বর্ষা এলেই নদী আরও একটু একটু করে পাড় ভাঙে। বাড়িতে জল ঢোকে, পুজোর জায়গা ভেসে যেতে বসেছে, কখনো পাকাবাড়িও দামোদর নদের গর্ভে মিলিয়ে যায়। বৈশাখ মাস থেকে কার্যত কাজ নেই। সরকার যদি অন্তত জাল আর সূতো দিত, তাহলে আবার নতুন করে নদীতে নামা যেত। এসময় মাছ ধরতে নদীর দিকে যাচ্ছিলেন হরেকৃষ্ণ বিশ্বাস। হাঁটতে হাঁটতেই বললেন, বর্ষায় প্রবল স্রোতের জন্য নদীতে নামা যায় না। তখন সংসার চলে ধার-দেনা করে। অতীতে প্রশাসনের কাছে বহুবার আবেদন জানিয়ে মৎস্যজীবী কার্ড পেলেও আর্থিক সাহায্য মেলেনি। বর্তমান সরকারের কাছে তাঁর আবেদন, অন্তত সামান্য আর্থিক সহায়তা কিংবা মাছ ধরার সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হোক। মৎস্যজীবীদের দাবি প্রসঙ্গে স্থানীয় বিজেপি নেতা সঞ্জীব বড়াল বলেন, এখনও পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প চালু করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে জানানো হয়েছে। আগামী দিনে সরকারি প্রকল্পের আওতায় তাঁদের আনার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা এবং বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত নৌকা ও জালের ক্ষতিপূরণের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
দামোদরের তীরে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে যায় ‘পদ্মা নদীর মাঝি’-র সেই চিরন্তন জীবনবোধ নদী কাউকে প্রতিশ্রুতি দেয় না, তবু মানুষ প্রতিদিন তার কাছেই ফিরে আসে। কারণ নদীর বুকেই লুকিয়ে থাকে তাদের অন্ন, আশ্রয়, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। দামোদরের এই মাঝিরাও সেই আশাতেই প্রতিদিন জাল কাঁধে নদীর দিকে হাঁটেন।