সবুজ বিশ্বাস, জঙ্গিপুর: শীতের ভোরে ঘুমভাঙা শহরের অলিতে-গলিতে তখনও কুয়াশার চাদর। এরই মাঝে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ক্ষুদিরাম মোড়ে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসছে মোহিত করা সুরেলা কণ্ঠ। যাঁর কণ্ঠ তাঁর সামনে জ্বলছে গনগনে উনুন। ফুটছে জলের কড়াই। একহাতে মাইক। অন্য হাতে চা ঢালছেন কাপে? চা-এর কাপে চুমুক দিয়ে যুবকের গানে তাল দিচ্ছেন খদ্দেররা। সেই চা ওয়ালা মনোজ শেখ এখন এলাকার জনপ্রিয় গানওয়ালা। তাঁর গান দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে পথচলতি মানুষকেও।
মনোজের বয়স চল্লিশের কোঠায়। জঙ্গিপুরে শহর লাগোয়া এলাকা মির্ধাপাড়ার বাসিন্দা মনোজ। পরিবারের হাল ধরতে দীর্ঘদিন ধরে ওই ছোট চায়ের দোকানটিই তাঁর একমাত্র সম্বল। তবে, ব্যবসার চেয়েও তাঁর বড় পরিচয়— তিনি একজন সঙ্গীত নিবেদিত প্রাণ। চা বানাতে বানাতে গান গাওয়া তাঁর বহুদিনের নেশা। আর সেই টানেই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল তিনি। দোকানের বিশেষত্ব একটাই—দোকানে এসে চা খেলেই গান ফ্রি। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি তীব্র অনুরাগ মনোজের। কিন্তু অভাবের তাড়নায় প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষার সুযোগ হয়নি। অভাবের সংসার চালাতে পড়াশোনাও বেশিদূর এগোয়নি। কিন্তু মনোজের মনে আজও বেঁচে রয়েছে বড় মঞ্চে গান গাওয়ার সুপ্ত স্বপ্ন। তিনি বলেন, ‘গান আমাকে কাজের শক্তি জোগায়। ছোট থেকেই খুব ইচ্ছে ছিল কোনো একদিন বড় মঞ্চে উঠে গান করব। প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও চায়ের সঙ্গে খদ্দেরদের মনের খোরাক জোগাতে এবং ভালো লাগা থেকেই এই গান গেয়ে যাই।’
মনোজের গান মানেই নস্টালজিয়া। আশির এবং নব্বইয়ের দশকের গানই তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। যে সময়টাকে আমরা বলি গানের স্বর্ণযুগ। মহম্মদ রফি, কিশোর কুমার, সাব্বির কুমার কিংবা মহম্মদ আজিজের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের গান তিনি সাবলীলভাবে গেয়ে চলেন। খদ্দেরদের অনুরোধে একের পর এক সেই সমস্ত পুরনো দিনের গান গেয়ে চলেছেন তিনি। অনেক সময় তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে গলা মেলান খদ্দেররাও। ভালো গান শোনানোর তাগিদে সম্প্রতি কিছু বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও কিনে ফেলেছেন এই চা ওয়ালা। মনোজের এই সুরের সাধনা জুগিয়েছে নতুন এক প্রাপ্তিও। তাঁর দোকানে গান শুনতে আসেন স্থানীয় সঙ্গীত প্রেমী, বন্ধুবান্ধব থেকে কয়েকজন শিক্ষক। মনোজের গলার জাদুতে মুগ্ধ হয়ে তাঁরা প্রতিদিন মনোজের দোকানে এসে হাজির হন। তাঁরা গান নিয়ে আলোচনা করেন। ভুলত্রুটি শুধরে একে অপরের থেকেই তালিম নেন।
চা বিক্রির ফাঁকে ফাঁকে গান গাওয়ার সুবাদে আজ শুধু ওই ক্ষুদিরাম মোড়েই নয়, গোটা জঙ্গিপুর জুড়েই পরিচিত মুখ মনোজ। চা-এর কাপে চুমুক আর সুরের মূর্ছনা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে জঙ্গিপুরের মানুষের কাছে এখন প্রতিদিনের এক অবিচ্ছেদ্য ঠিকানা মনোজের চায়ের দোকান। মনোজ গেয়ে চলেন—ইসসে পেহেলে কি ইয়াদ তু আয়ে...।



