নিজস্ব প্রতিনিধি, মেদিনীপুর: শ্মশানের নিস্তব্ধতা, তন্ত্রসাধনার রহস্য আর লোকমুখে প্রচলিত হাড় হিম করা সব নানা কাহিনী। সব মিলিয়ে মেদিনীপুর শহরের মহাতাবপুরের উগ্রতারা মায়ের মন্দির ঘিরে রয়েছে এক বিস্ময়কর ইতিহাস। কথিত আছে, একসময় এই মন্দিরে নরবলির প্রথাও প্রচলিত ছিল। তন্ত্রসাধনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের করোটি ও অস্থি ব্যবহারের নানা জনশ্রুতি। কালীপুজো ঘিরে প্রতিবছর এই মন্দিরে ভক্তের ঢল নামে। এবারও আলোর উৎসবে হাজার, হাজার মানুষের সমাগমের অপেক্ষায় রয়েছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় নিকটবর্তী এক গ্রামে এক গেরস্তের হাতে খুন হন তাঁর স্ত্রী ও স্ত্রীর উপপতি। পরে এক তান্ত্রিক সাধক তাঁদের মৃতদেহ তন্ত্র সাধনার কাজে ব্যবহার করেন। মাটির তৈরি ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা উগ্রতারা মূর্তির ভিতরে ওই মৃতদেহের অস্থি তন্ত্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংযোজিত করা হয়। এরপর পদ্মাবতী মহাশ্মশানের কাছে মন্দির নির্মাণ করে দেবীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয়। সেই থেকেই মহাতাবপুরে উগ্রতারার আরাধনা হয়ে আসছে বলে জানা গিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেইসময় গোটা এলাকা ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। এক অজ্ঞাতপরিচয় সাধুবাবা এই এলাকায় এসে বাস করতে থাকেন। তিনি হিন্দি ও বাংলা মিশিয়ে কথা বলতেন। মন্দির নির্মাণের জন্য স্থানীয়দের কাছে জমিও চেয়েছিলেন। শোনা যায়, রটন্তী চতুর্দশীর রাতে পুজো শুরুর আগে নরবলি দেওয়া হত। এমনকী, সেই খবর পেয়ে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে ধরতে এলেও নরবলির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
মন্দিরের পুজোর রীতিতেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। সাধারণ প্রতিমার মতো এখানে খড় ব্যবহার করা হয় না। কুশ দিয়ে কাঠামো তৈরি করে তার উপরে মাটি দিয়ে দেবীর মূর্তি নির্মাণ হয়। ১২ বছর অন্তর দেবীর নবকলেবর হয়। সেইসময় পুরানো প্রতিমা কংসাবতী নদীতে বিসর্জন দেওয়া হলেও তার আগে দেবীর শরীর থেকে সব অস্থি বের করে নেওয়া হয়। পরে নতুন প্রতিমার কাঠামোয় সেগুলি পুনরায় সংযোজিত হয়ে থাকে।
মন্দিরে আজও পাঁচটি খুলি দিয়ে তৈরি পঞ্চমুণ্ডির আসন রয়েছে। যা তন্ত্রসাধনার অন্যতম প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
কথিত আছে, দেবীর মুখমণ্ডলে ব্রাহ্মণ কুমারীর করোটি, শিবের মুখমণ্ডলে ব্রাহ্মণ পুরুষের করোটি এবং শবদেহের অংশে চণ্ডালের করোটি রয়েছে। দেবীর নবকলেবরের সময় চক্ষুদানের মুহূর্তে এক নাবালক ব্রাহ্মণ বালকের মৃত্যুর কাহিনিও প্রচলিত রয়েছে। তাঁর চিতার আগুন থেকেই দেবীর যজ্ঞ সম্পন্ন করা হয় বলে জনশ্রুতি আছে।
মন্দিরের নিত্যভোগে থাকে পঞ্চব্যঞ্জন। প্রধান ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় শোল মাছ পোড়া। প্রতি অমাবস্যায় চণ্ডীপাঠ, বিশেষ পুজো ও তন্ত্রসাধনার আয়োজন হয়। কালীপুজোর রাতে চালকুমড়ো, আখ ও কলা বলির প্রথাও রয়েছে। গত ১৬ বছর ধরে মায়ের পুজো করে আসছেন পুরোহিত দুর্গাশঙ্কর মিশ্র। তিনি বলেন, মায়ের উপস্থিতি এখানে অনুভব করা যায়। নিষ্ঠা ও নিয়ম মেনেই প্রতিদিন পুজো হয়। উগ্রতারা মা মন্দির উন্নয়ন কমিটির সম্পাদক গৌতম পাকিরা বলেন, প্রতিবছর প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষের সমাগম হয়। এবছরও কালীপুজোর দিন রেকর্ড সংখ্যক ভক্তের ভিড় হবে বলে আশা করছি।-



