Bartaman Logo
৮ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

রসায়নের শিক্ষক নিজের হাতেই গড়েন দুর্গা, দেশ-বিদেশ থেকে আসেন প্রাক্তন পড়ুয়ারা, নিমতায় অভিনব পুজো, হাত লাগান সংখ্যালঘু ছাত্ররাও

রসায়নের শিক্ষক তিনি। গত ৩৪ বছর ধরে নিজের হাতেই দুর্গা প্রতিমা গড়ে পুজো করছেন নিমতার পাইকপাড়ার বাড়িতে।

রসায়নের শিক্ষক নিজের হাতেই গড়েন দুর্গা, দেশ-বিদেশ থেকে আসেন প্রাক্তন পড়ুয়ারা, নিমতায় অভিনব পুজো, হাত লাগান সংখ্যালঘু ছাত্ররাও
  • ৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: রসায়নের শিক্ষক তিনি। গত ৩৪ বছর ধরে নিজের হাতেই দুর্গা প্রতিমা গড়ে পুজো করছেন নিমতার পাইকপাড়ার বাড়িতে। তবে নিজে পুজোয় বসেন না, পুরোহিতের আসনে বসেন মেজ ভাই অঙ্কের শিক্ষক বিভাস বসু। মহালয়ার দিন মায়ের চক্ষুদান করেন ছোটো ভাই প্রভাসের স্ত্রী। প্রতিমা গড়া থেকে পুজোয় আয়োজন— সব কাজেই তাঁর সঙ্গে হাত লাগান কয়েকশো পড়ুয়া। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অগুনতি ছাত্রছাত্রী, যাঁরা পুজোর সময় বাড়িতে আসেন, অষ্টমীর দিন তাঁদের আসা চাই স্যরের বাড়িতে। তাঁদের কেউ ইসরোর বিজ্ঞানী, কেউ নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গবেষক, কেউ আবার ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার। দধিকর্মা থেকে প্রসাদ বিতরণ, সব কাজেই হাত লাগায় পড়ুয়ার দল। তার মধ্যে ভিন ধর্মের ছাত্রছাত্রীরাও রয়েছে। রসায়নের এই শিক্ষক নিজে আবার মগ্ন থাকেন নেতাজি গবেষণায়। পাশাপাশি চলে মূর্তি, স্ট্যাচু, ছবি আঁকার কাজ। তবে নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতেই বেশি পছন্দ করেন ষাটোর্ধ্ব শিক্ষক সুভাষচন্দ্র বসু।  

Advertisement

নিমতা পাইকপাড়া কৃষ্ণকানন জয়ভবনের বাসিন্দা সুভাসবাবু। তিনি রসায়নের গৃহশিক্ষক। মেজ ভাই বিভাস বসু সরকারি স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক। ছোটো ভাই প্রভাস বসু গৃহশিক্ষকতা ইংরেজি বিষয়ে। এই পরিবার আদতে খুলনার সাতক্ষীরার বাসিন্দা। ছেচল্লিশের দাঙ্গার সময় দাদু গোটা পরিবার নিয়ে চলে আসেন কলকাতার মুরারিপুকুরে এক আত্মীয় বাড়িতে। পরে নিমতায় জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেন। সাতক্ষীরার বাড়িতে এক সময় দুর্গাপুজো, কালীপুজো হলেও তাঁরা এক কাপড়ে এদেশে এসে আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়েন। সুভাষবাবুর বাবা কালীপদ বসু সরকারি চাকরি পাওয়ার পর পরিবারের হাল ফেরে। ছোটো থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি মূর্তি বানানোর নেশা ছিল সুভাষবাবুর। ১৯৯২ সালে নিজে প্রথম দুর্গাপ্রতিমা গড়ে শুরু করেন পুজো। রথে কাঠামো পুজোর পর শুরু হয় প্রতিমা গড়ার কাজ। মহালয়ার ভোরে সূর্যোদয়ের আগেই চক্ষুদান হয় মায়ের। আরাধনা হয় বৈষ্ণব মতে। সুভাষবাবু গৃহশিক্ষকতা করছেন ১৯৮৯ সাল থেকে। তখন থেকেই এই বাড়ি ছাত্রছাত্রীদের কাছে হয়ে উঠেছে তাদের দ্বিতীয় ঘর। পড়ুয়ারাই পরম আত্মীয়। রীতি মেনে পুজোর তন্ত্রধারক হয় কোনো এক ছাত্র। ষষ্ঠী থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের মিলন মেলায় পরিণত হয় জয়ভবন। অষ্টমীর দিনে খিচুড়ি ভোগ খেতে হাজির হন কমপক্ষে ২০০-২৫০ বর্তমান ও প্রাক্তন পড়ুয়া। তাঁদের অনেকে বিদেশে স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। দশমীতে বিসর্জন।
প্রভাসবাবু বলেন, আমাদের প্রতিমায় রয়েছে চমক। কথায় আছে, সুশিক্ষা আনে সমৃদ্ধি— এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই পাশাপাশি রাখা হয় সরস্বতী ও গণেশকে। আবার ধনসম্পদকে রক্ষা করতে দরকার যোদ্ধা। তাই লক্ষ্মীর পাশে থাকে কার্তিক। জয়ভবনে পা রাখলেই মনে হবে সারা বাড়ি যেন একটি মিউজিয়াম। মণীষীদের মূর্তি, দেওয়াল জুড়ে চিত্রপট, দাদু ও ঠাকুমার ব্যবহার্য সামগ্রীর সংগ্রহশালা। নেতাজি বিষয়ক নানা তথ্যে ভরা গ্যালারি। সবই একা হাতে সামলান অবিবাহিত সুভাষচন্দ্র বসু। গান ও নাটকও লেখেন। লাজুক স্বভাবের সুভাষবাবু বলেন, আমি তো নিমিত্ত মাত্র। সৃষ্টিকর্তাই আমাকে দিয়ে করান। ছাত্ররাই তো আমার প্রাণ। আমার ছাত্রছাত্রীরা আজ প্রতিষ্ঠিত। এটাই আমার তৃপ্তি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ