শ্রীকান্ত পড়্যা, তমলুক: তমলুক ও লাগোয়া এলাকায় মাইকিং হচ্ছিল, ‘ক্যালকাটা কর্পোরেশনের পূর্বতন মেয়র ও বর্তমান অল্ডারম্যান সুভাষচন্দ্র বসু তমলুকে আসবেন। তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হবে। থানা সংলগ্ন ময়দানে(রাজবাড়ি ময়দান) সভা হবে।’ মুহূর্তের মধ্যে এখবর পৌঁছে যায় তদানীন্তন পুলিশকর্তাদের কাছে। মেদিনীপুরের তৎকালীন জেলাশাসক নিজেই হ্যামিল্টন স্কুলের সম্পাদক শরৎচন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে(প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের পিতা) চিঠি লেখেন যে, রাজ ময়দানে ওই সভা হলে হ্যামিল্টন স্কুলের অনুমোদন বাতিল ও তমলুকের মানুষের বিরাট ক্ষতি হবে।
ব্রিটিশ প্রশাসনের ওই চিঠি নিয়ে হইচই শুরু হয়। দুশ্চিন্তায় পড়েন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজক তমলুক মহকুমা কংগ্রেস নেতৃত্ব। বিকল্প সভাস্থল খোঁজা শুরু হল। ব্রিটিশ হুংকারকে আমল না দিয়ে তাম্রলিপ্তের রাজা সুরেন্দ্রনারায়ণ রায় নিজের বাড়িতে সভা আয়োজনে উদ্যোগী হলেন। রাজবাড়ির আমবাগান কেটে সেখানেই সভাস্থল তৈরি হয়। প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই বহু মানুষ জমায়েত করলেন। তাঁদের নিজের বক্তৃতার মাধ্যমে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করলেন দেশবরেণ্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।
১৯৩৮সালের ১১এপ্রিল নেতাজির তমলুক আসার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে রেখেছে পুরসভা থেকে শুরু করে রামকৃষ্ণ মিশন। সুভাষচন্দ্র কলকাতা থেকে ট্রেনে প্রথমে পাঁশকুড়ায় আসেন। পাঁশকুড়ার জোড়াপুকুরে তিনি সংবর্ধিত হন। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহ হুডখোলা জিপে তাঁকে তমলুকে আনা হয়। তমলুকের বৈকুণ্ঠধামে সতীশ চক্রবর্তীর বাড়িতে ওঠেন। সুভাষচন্দ্র নিজেই রান্না করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সতীশবাবুর স্ত্রী ইন্দুপ্রভাদেবী তাতে আপত্তি করেন। তিনি নিজের হাতে সুস্বাদু নানা পদ বানিয়ে সুভাষচন্দ্র বসুকে খাইয়েছিলেন। তমলুকে থাকাকালীন রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমে গিয়ে ভিজিটর্স বুকে নিজের মন্তব্য লেখেন সুভাষ। সেই মন্তব্য বাঁধিয়ে রেখেছে মিশন কর্তৃপক্ষ। সুভাষচন্দ্র বসু বর্গভীমা মন্দিরে গিয়ে দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করার শপথ নেন। এরপর পুরসভায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যান। ১৯৩৮সালের ৪এপ্রিল পুরসভা বোর্ড মিটিং করে সুভাষচন্দ্রকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সেই সংবর্ধনার খরচ পুরসভার তহবিল থেকে নয়, বরং চাঁদা তুলে জোগাড় করা হয়েছিল। ১২এপ্রিল সুভাষচন্দ্র বসু তমলুক থেকে মুগবেড়িয়ার উদ্দেশে রওনা দেন। চণ্ডীপুরে অসংখ্য মানুষ রাস্তার ধারে তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন। সেখানে নেমে রামকৃষ্ণ মিশনে যান। স্থানীয়দের আর্জি মেনে চণ্ডীপুরে বক্তৃতাও দেন। শ্রীকৃষ্ণপুরেও তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়। এরপর তিনি মুগবেড়িয়ায় পৌঁছান। ক্ষুদিরাম বসু মুগবেড়িয়ায় কোথায় ছিলেন, তা মুগবেড়িয়া হাইস্কুলের তৎকালীন সম্পাদক বীরজাচরণ নন্দের কাছে জেনে নেন। ওই স্কুলের কাছে তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। এখন সেই জায়গা সুভাষপল্লি নামে পরিচিত। নেতাজির পূর্ণাবয়ব মূর্তিও সেখানে রয়েছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ তথা প্রাক্তন বিধায়ক ব্রহ্মময় নন্দ বলেন, সুভাষচন্দ্র বসু তমলুকে এসে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আরও জাগ্রত করে তোলেন। ১১এপ্রিল রাতে বৈকুণ্ঠধাম লাগোয়া তদানীন্তন মহকুমা কংগ্রেস সভাপতি মহেন্দ্রনাথ মাইতির বাড়িতে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে সতীশচন্দ্র সামন্ত, অজয় মুখোপাধ্যায়, কুমারচন্দ্র জানা সহ কংগ্রেসের বিশিষ্ট নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ রাজর্ষি মহাপাত্র বলেন, ৮৮বছর আগে তমলুক পুরসভায় এসে সুভাষচন্দ্র যে চেয়ারে বসেছিলেন, সেটি সংরক্ষণ করে রাখা আছে। নেতাজির তমলুকে আসার ইতিহাস মানুষ গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন।