নিজস্ব প্রতিনিধি ও সংবাদদাতা: রথযাত্রা উৎসবে শুক্রবার শহরতলি উৎসব মুখর। সব জায়গায় প্রচুর ভক্ত সমাগম। রশিতে টান। মনোবাঞ্ছা পূরণে ভগবানের কাছে প্রার্থনা। সঙ্গে একাধিক জায়গায় দুর্গোৎসবের খুঁটিপুজোও হয়। তবে উৎসবের তাল কিছুটা কেটেছে ডানকুনিতে। সেখানে রথের চূড়া ভেঙে তিন মহিলা জখম। প্রাথমিক চিকিৎসার পর দু’জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে একজন এখনও চিকিৎসাধীন।
এদিন দুপুর থেকেই শহরতলির প্রায় সব পাড়ায় ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনি। মাসির বাড়ি চলেছেন প্রভু জগন্নাথ। সঙ্গে বলরাম ও সুভদ্রা। তা দেখতে রাস্তায় অসংখ্য মানুষের ভিড়। শিশু থেকে বুড়ো, প্রত্যেকে হাজির। রথের মেলায় জিলিপির প্যাঁচ দিচ্ছেন ময়রারা। রাস্তা-অলিগলিতে গরম তেলে পাঁপড় পড়ছে। গলিগুলিতে ছোট রথ নিয়ে হাজির কচিকাঁচারা। গলিপথ চলে গিয়েছে তাদের দখলে। হুগলি থেকে হাওড়া, নদীয়া থেকে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার সব এলাকার ছবিটা এরকমই।
হুগলির মাহেশ ও গুপ্তিপাড়ার রথ বিখ্যাত। এছাড়া চন্দননগরে যদুবাবু বা যাদুবাবুর রথও উল্লেখযোগ্য। জগন্নাথধামে যেতে না পারার দুঃখ থেকে জগন্নাথের রথ এই এলাকায় এককালে চালু করেছিলেন ধনী ব্যবসায়ী যাদবেন্দু ঘোষ। এছাড়া জেলা সদর চুঁচুড়াতে নতুন, পুরনো মিলিয়ে সাতটির মতো রথযাত্রা হয়। বারুইপুরের রাসমাঠে রায়চৌধুরী পরিবারের ৩৫০ বছরের রথ প্রথা মেনে ব্রিটিশ আমলের (১৯১১) লোহার ‘মাস্তুল’ দিয়ে টানার রীতি। একমাস রাসমাঠে চলবে মেলা। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সঙ্ঘের (ইস্কন) পরিচালনায় তারকেশ্বরে রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। আধুনিক পদ্ধতিতে তৈরি প্রায় ৪০ ফুট উঁচু রথ ঘন জনবসতিপূর্ণ জায়গা দিয়েও যেতে সক্ষম। প্রয়োজনে এর চূড়া ছোট বড় করা যায়। ধনেখালির দশঘড়ায় প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো রথ ও জাঙ্গিপাড়ার রাজবলহাট মেলায় ব্যাপক ভিড় জমেছিল।
উত্তর ২৪ পরগনায় রথযাত্রা কেন্দ্র করে কামারহাটির রথতলা মোড়ে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বিটি রোডে ৩৫০ বছরের প্রাচীন ঘোষাল বাড়ির রথের পাশাপাশি আরও একটি রথ বের হয়। এখানে জগন্নাথদেবের স্থায়ী মন্দিরও রয়েছে। পুরীর আদলে তিনটি কাঠের রথ তৈরি হয়েছিল। এছাড়া দক্ষিণ দমদমের জপুরে নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দির থেকেও বের হয় রথ। দত্তপুকুরের কালাচাঁদ পাড়ায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকায় দুর্গোৎসবের খুঁটিপুজো হয়েছে। দীঘায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে যে রথযাত্রা হয়েছে তার লাইভ সম্প্রচার দেখানো হয়েছে জেলার বিভিন্ন জায়গায়। এদিন রথযাত্রায় শাসনের সর্দারআটিতে সম্প্রীতির ছবি দেখা গিয়েছে। বনগাঁর বাটার মোড়ে যশোর রোডের দু’পাশ দিয়ে রথের মেলা বসে। এখানকার অন্যতম চিন্তামার রথ। নৈহাটিতে বঙ্কিমচন্দ্রের পারিবারিক রথযাত্রা সাড়ম্বরে পালিত হয়েছে। তাতে রীতি মেনে ছিলেন না জগন্নাথদেব। ছিলেন বলভদ্র, রাধাবল্লবজিউ ও অনন্তদেব। শ্যামনগরের আতপুরে দু’শো বছরের প্রাচীন রথ রীতি মেনে বের হয়।
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বৃষ্টির মধ্যেও অনুষ্ঠান হয়েছে। কাকদ্বীপজুড়ে ছিল উন্মাদনার ছবি। বারুইপুর প্রগতি সঙ্ঘ ও সুবুদ্ধিপুর সমন্বয় কমিটির প্রথম বর্ষের রথযাত্রার এদিন সূচনা হয়। বিশালক্ষ্মীতলা মন্দিরে রথ পৌঁছনোর পর হয় ৫৬ ভোগ নিবেদন।
হাওড়ায় শতাব্দী প্রাচীন উলুবেড়িয়ার শ্রী শ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি থেকে রথ বের হয়ে শহর পরিক্রমা করে এদিন। গড়ভবানীপুরে ইসকনের রথের সামনে ঝাঁট দিয়ে যাত্রার সূচনা হয়। উলুবেড়িয়ায় রথের দড়িতে টান দিয়েছে বিশেষভাবে সক্ষম শিশুরা। ধুমধাম করে রথযাত্রা হয়েছে পাঁচলাতেও। সালকিয়ার রাম-সীতা নতুন মন্দিরের কাছ থেকে বের হওয়া রথযাত্রায় অংশ নেন বহু মানুষ। ফুলতলাঘাট বা ব্যানার্জি ঘাট থেকেও দু’টি রথযাত্রায় বহু মানুষ পা মেলান। ঘুসুড়ির জগন্নাথ ঘাট, বেলুড় ঠাকুরণ পুকুরের রথ দেখতে ভিড় জমান মানুষ। বাবুরডাঙা, বেনারস রোডের ঘোষপাড়া, বালি বাজারের রথযাত্রা খুব বিখ্যাত। সর্বত্রই যানজট সামলাতে মোতায়েন ছিল পুলিস।
নদীয়ার কল্যাণী রামকৃষ্ণ মিশনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। মঠের সহাধ্যক্ষ পুজনীয় স্বামী সুহিতানন্দজি মহারাজ সহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।