সংবাদদাতা, কাঁথি: চারদিন পার হয়ে গিয়েছে। রামনগরের শঙ্করপুর মৎস্যবন্দর থেকে মাছ ধরতে গিয়ে ট্রলার সহ নিখোঁজ মৎস্যজীবীদের শুক্রবারও সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো খবর মিলল না। সময় যত গড়াচ্ছে, বন্দর চত্বরে ততই ভিড় বাড়ছে মৎস্যজীবীদের পরিবারের লোকজন এবং তাঁদের আত্মীয়স্বজনদের। ক্রমশই বাড়ছে উৎকন্ঠা ও দুশ্চিন্তা। নিখোঁজ ১৫ জনের মধ্যে শঙ্করপুর সহ আশপাশের এলাকারই বাসিন্দা আটজন। বাকিদের মধ্যে তিনজন ওড়িশার বালেশ্বরের, দু’জন নদীয়ার, একজন হাওড়ার ও আর একজন পটাশপুরের বাসিন্দা। চারদিন ধরে মৎস্যজীবীদের কোনো হদিশ না মেলায় শঙ্করপুর মৎস্যবন্দর এলাকায় এখন শুধুই কান্নার রোল। সেখানে নিখোঁজ মৎস্যজীবীদের স্ত্রী ও মা-বোনেরা কেউ মাঝেমধ্যে ডুকরে কেঁদে উঠছেন, কেউ জ্ঞান হারাচ্ছেন। ওই মৎস্যজীবীদের পরিবারে হাঁড়ি চড়ছে না। স্বজনদের ফিরে আসার জন্য সমুদ্রের দিকে চেয়ে তাঁরা আকূল প্রার্থনা করে চলেছেন। নিখোঁজ মৎস্যজীবীদের পরিবারের লোকজনের আশা, যেখান থেকে তাঁরা সমুদ্রের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেখানে হয়তো আবার ফিরে আসবেন। সেই আশায় বুক বেঁধেই নাওয়া খাওয়া ছেড়ে তাঁরা বন্দর চত্বরেই রাতদিন বসে রয়েছেন।
এদিকে উদ্ধারকাজের জন্য কোস্টগার্ডের তরফে চারটি বোট ও ছোট জাহাজ নামানো হয়েছে। আকাশপথে নজরদারির জন্য এবং নিখোঁজ হওয়া ট্রলারের অবস্থান নির্ধারণ করতে উড়ছে কোস্টগার্ডের বিশেষ হেলিকপ্টারও। কোস্টগার্ডের জিপিএস ট্র্যাকারের সূত্র অনুযায়ী, জলধা ব্রিজ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে শেষবার অবস্থান ছিল ট্রলারটির। তারপর থেকে সব যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন। বৃষ্টি ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় বৃহস্পতিবার উদ্ধার কাজে বিঘ্ন ঘটেছে। শুক্রবার বৃষ্টি কম থাকায় তল্লাশিতে জোর দেওয়া হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার মৎস্যমন্ত্রী রাজেশ মাহাতো শঙ্করপুরে গিয়ে নিখোঁজ মৎস্যজীবীদের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি বলেন, মৎস্যজীবীদের উদ্ধারে প্রশাসন সবরকম চেষ্টাই জারি রেখেছে। গত ২ জুলাই শঙ্করপুর থেকে ‘জয় মা কালী’ নামের ট্রলারে মাছ ধরতে যান ১৫ জন মৎস্যজীবী। ৫ জুলাই ওই মৎস্যজীবীদের সঙ্গে শেষবার দেখা হয় সহকর্মী অন্যান্য ট্রলারের মৎস্যজীবীদের। কথা হয় পরিবারের লোকজনের সঙ্গেও। ৬ জুলাই দুপুর ১২টার পর থেকে ট্রলার সহ মৎস্যজীবীদের আর কোনো খোঁজ নেই। ওয়্যারলেস কিংবা কোনো মাধ্যমেই মৎস্যজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। গভীর সমুদ্রের চেনা পথই যেন অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। নিখোঁজ মৎস্যজীবীদের মধ্যে শঙ্করপুর সংলগ্ন চাঁদপুরের বিবেকানন্দ গিরি, কায়মার নিত্যানন্দ রাউত, দক্ষিণ বলরামপুরের প্রদীপ মাঝির পরিবারের লোকজন বলছেন, ওঁরা কোথায় কী অবস্থায় আছেন, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। শঙ্করপুর ফিশারমেন অ্যান্ড ফিশ ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক স্বদেশরঞ্জন নায়ক বলেন, মৎস্যজীবীদের কোনো খবর না পেয়ে আমরা রীতিমতো উদ্বিগ্ন। আমরা সুসংবাদের আশায় প্রহর গুনছি। রামনগরের বিধায়ক চন্দ্রশেখর মণ্ডল বলেন, ওড়িশা বা পেটুয়াঘাট বন্দরে ফিরে আসা অন্যান্য ট্রলারেও নিখোঁজ দলটির সন্ধানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আমরা মৎস্যজীবীদের পরিবারের লোকজনকে ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানিয়েছি। উপকূলের থানাগুলির দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিএসপি (ডি অ্যান্ড টি) মোহিত মোল্লা বলেন, ট্রলারে থাকা ‘ট্রান্সপন্ডার’ নামক যন্ত্রের সাহায্যে মূলত মৎস্যজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। আমরা মনে করছি, সেই যন্ত্র বিকল হয়ে গিয়েছে। ফলে মৎস্যজীবীরা কোথায় রয়েছেন, সেটা জানা যাচ্ছে না। সে কারণেই যোগাযোগ হচ্ছে না। উপকূলবর্তী সব থানার পাশাপাশি দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা পুলিশ এবং ওড়িশা পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছে। কোনো খবর পেলেই তৎক্ষণাৎ আমাদের জানাতে বলেছি।