


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: গত দু’বছর ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়েছে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্টে’র জাল। সাইবার জালিয়াতদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন বাংলার বহু বাসিন্দাও। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের তদন্তে উঠে আসে, গোটা প্রতারণা চক্রের ‘এপি সেন্টার’ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া। ডিজিটাল অ্যারেস্টের প্রতিটি ঘটনা খতিয়ে দেখে কেন্দ্রের ‘ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টার’ (আইফোরসি) জেনেছে, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া টাকার সিংহভাগ পৌঁছেছে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন, সিয়ানুকভিল, বাভেট, পয়পেট এবং কোকংয়ের মতো শহরে। সাইবার প্রতারকদের সেই গড়েই এবার হামলা! কম্বোডিয়ার ১৩৮টি এলাকায় হানা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৯টি দেশের তিন হাজারেরও বেশি ‘সাইবারদাস’কে। ধৃতদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয়। এমনকী সাতজন বাঙালিও রয়েছে বলে খবর। বাকিরা দিল্লি, এনসিআর, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু এবং জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দা। ভারতীয় সাইবার গোয়েন্দারা বলছেন, কম্বোডিয়া এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাইবার প্রতারণার রাজধানী। শুধু ডিজিটাল অ্যারেস্ট নয়, সেখান থেকে পাতা হচ্ছে অনলাইন জুয়া ও লটারি, রোমান্স চ্যাট, শেয়ার ট্রেডিং, সেক্সটরশন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের ফাঁদ। আর এর মাধ্যমে প্রতিমাসে ভারত থেকে লুট হচ্ছে প্রায় হাজার কোটি টাকা।
কম্বোডিয়ার জালিয়াতদের বিভিন্ন ঘাঁটিগুলিতে ভারতীয় যুবক-যুবতীদের আটকে রেখে ‘সাইবারদাস’ বানানো হয়েছে—এই খবর আসতেই শোরগোল পড়ে যায় গোয়েন্দা মহলে। সেব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য হাতে আসার পর কম্বোডিয়া সরকারকে তা জানায় ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, বিদেশ মন্ত্রক এবং আইফোরসি। দু’দেশের আধিকারিকদের মধ্যে বৈঠকও হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, এরপরই কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেতের নির্দেশে রাজধানী নমপেন সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযানে নামে মিলিটারি পুলিস ও সেনা। গত ২৭ জুন থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত চলা ওই অভিযানের ফল ওই বিপুল গ্রেপ্তারি। ধৃত ভারতীয়দের ‘ভবিষ্যৎ’ নিয়ে নয়াদিল্লির সঙ্গে কথাবার্তা বলছে নমপেন কর্তৃপক্ষ। সূত্রের খবর, জালিয়াতদের ঘাঁটিগুলি থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, মাদকের সঙ্গেই উদ্ধার করা হয়েছে মুম্বই, দিল্লি, চেন্নাই, শ্রীনগর, জয়পুর, চণ্ডীগড় এবং লখনউ পুলিসের শীর্ষকর্তাদের মতো উর্দি। এমনকী সিবিআই, নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো, এনআইএ এবং কাস্টমসের এমব্লেমও। এই সমস্ত সামগ্রী ‘ডিজিটাল অ্যারেস্টে’র কাজে ব্যবহার করা হতো।
কম্বোডিয়ার ওই সমস্ত শহরকে ‘গ্লোবাল সাইবার ফ্রড’ সেন্টার বলে ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছে ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম। বিভিন্ন দেশের কর্মপ্রার্থী যুবক-যুবতীদের প্রতিষ্ঠিত সংস্থায় মোটা বেতনের টোপ দিয়ে আনা হচ্ছে কম্বোডিয়ার শহরে। আর সেখানে আসার পর কার্যত সাইবার প্রতারক চক্রের কাছে ‘বন্ধক’ রাখা হচ্ছে তাদের। এই চক্রের এজেন্টরা এখন ভারতের দিল্লি, নয়ডা, গুরুগ্রাম, সুরাত, মুম্বইয়ের মতো শহরে সক্রিয়। তাদের মাধ্যমেই চোরাপথে ভারতীয় সিমকার্ডও পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশি প্রতারকদের কাছে। এমনকী ডিজিটাল অ্যারেস্টে যুক্ত থাকার ১৮ জুলাই যে ন’জনকে সাজা দিয়েছে কল্যাণী আদালত, তাদের আদায় করা টাকাও পৌঁছে গিয়েছিল নমপেনে।