সমৃদ্ধ দত্ত: বঙ্গ বিজেপির সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হল, এই দলের ভাবমূর্তিতে বঙ্গ কম, বিজেপি বেশি। বিজেপি তার জন্মমুহূর্ত থেকেই বঙ্গকে অবহেলা এবং পরিত্যাগ করেছে। কেন? কারণ, আজকের বিজেপির পূর্বসূরি হল ভারতীয় জনসংঘ। যে দল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সৃষ্টি করে গিয়েছিলেন। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মধ্যে একটি নতুন দল গঠন করে প্রভূত সাফল্যও পাওয়া গিয়েছিল। বস্তুত পরবর্তী দশকগুলিতে ক্রমেই জনসংঘ একাই হয়ে উঠেছিল কংগ্রেস বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরের অন্যতম প্রধান অনুঘটক। বিরোধীরা জোট বেঁধে যখন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়াই করেছিল, তখনও জনসংঘ অন্যতম প্রধান কারিগর ছিল সেই জোটের। স্বতন্ত্র পার্টি কিংবা সোশ্যালিস্ট পার্টি অথবা বামপন্থীদের গোটা উত্তর ও পশ্চিম ভারতজুড়ে সংগঠন ছড়ানো ছিল না। সেই উপস্থিতি বরং ছিল জনসংঘের। ১৯৭৭ সালে বৃহত্তর জোট জনতা দলের সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য অটলবিহারী বাজপেয়ি ও লালকৃষ্ণ আদবানিরা এত বছরের একটি সফল রাজনৈতিক দল জনসংঘকে হঠাৎ বন্ধই করে দিলেন। জনতা দলের অযোগ্য এক্সপেরিমেন্ট ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৮০ সালে সেই বাজপেয়ি এবং আদবানিদের কী করা উচিত ছিল? উচিত ছিল না যে, আবার সেই ভারতীয় জনসংঘকেই ফিরিয়ে এনে পুনরায় পৃথক একটি হিন্দুত্ববাদী
দল হিসেবে নতুন করে আত্মপ্রকাশ করা? যার নির্বাচনী প্রতীকও শ্যামাপ্রসাদই স্থির করে গিয়েছিলেন এবং বহুল নির্বাচন ওই প্রতীকেই সংঘটিত হয়েছে। প্রদীপ। কিন্তু হিন্দি বলয়ের হিন্দুত্ববাদী নেতারা বাঙালি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের তৈরি করা জনসংঘ ফিরিয়ে আনলেন না। নিজেরাই নিজেদের নতুন দল তৈরি করলেন। ভারতীয় জনসংঘের পরিবর্তে ভারতীয় জনতা পার্টি। অর্থাৎ বাজপেয়ি আদবানিদের কাছে একঝাঁক দলের জোটের যে নাম, যাদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল একজন ব্যক্তি ইন্দিরা গান্ধীকে গদিচ্যুত করা, সেই ‘জনতা দল’ নামাঙ্কনটি বেশি গ্রহণযোগ্য হল। জনসংঘকে তারা সম্পূর্ণ মুছে দিলেন। কেন? শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির দলের পরিবর্তে নতুন যে দল হিন্দি হিন্দু বলয়ের অন্যতম চালিকাশক্তি হতে চাইল, সেটির পরিচয় হয়ে গেল বাজপেয়ি-আদবানির দল। পরবর্তী নতুন প্রজন্মের কাছে ক্রমেই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির পরিচয়ও ফিকে হয়ে যেতে লাগল। তাই সবথেকে বড় প্রশ্ন হল, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নামাঙ্কিত দলের নাম বর্জন করলেন কেন বিজেপির প্রতিষ্ঠাতারা? যাঁরা দুজনেই ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অন্যতম প্রধান অনুগামী। বাজপেয়ি তো সরাসরি ব্যক্তিগত সচিবই ছিলেন।
ঠিক এই কারণেই ভারতীয় জনসংঘকে আধুনিক রাজনীতি আর মনেই রাখেনি। এখন ভারতীয় জনতা পার্টি সেই নীতি ও আদর্শকে গ্রহণ করে নিজেরা পৃথক এক বৃহত্তম দলে পরিণত হয়েছে। সেই ভারতীয় জনতা পার্টি যখন বহু বছর পর বাংলাতেও বড়সড় এক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, তখন সবথেক দ্রুত যা অন্তর্হিত হয়েছে, সেটি হল বাঙালিত্ব। অতিরিক্ত দিল্লি নির্ভরতাই বঙ্গবিজেপির সবথেকে বড় প্রতিবন্ধকতা। নিজস্বতা নেই। সেটা না করে উপায় নেই। কারণ বঙ্গবিজেপির নেতৃত্ব অথবা সংগঠন দিল্লি থেকে আসা আর্থিক বরাদ্দের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। রাজনৈতিক দল চালাতে গেলে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়, সেটি বঙ্গবিজেপিকে দেয় দিল্লির বিজেপি। স্বাভাবিকভাবেই নরেন্দ্র মোদির মুখ ও অমিত শাহের সংগঠনের দিশানির্দেশ মুখ বুজে অনুসরণ করা ছাড়া বঙ্গবিজেপির পথ নেই। কোনও বিকল্প নেই। বহু দিন ধরেই মিটিং মিছিল সমাবেশে ভিড় জড়ো করাতে টাকা খরচ করতে হয়। দিল্লি, লখনউ, কলকাতা সর্বত্রই একটি বিশেষ শ্রেণিকে মিটিং মিছিলে আনা হয় টাকার বিনিময়ে। এর মধ্যে কোনও গোপনীয়তা নেই। সকলেই জানে। আজকের মিডিয়া বিপ্লবের যুগে এই মিছিল সমাবেশে আগত শ্রেণি সরলতার সঙ্গে বলেও দেয় যে, তাদের কত টাকা দেওয়া হয়েছে। মূলত নিম্নবর্গকেই টার্গেট করা হয়। আর তাছাড়া যে নিচুতলার কর্মীরা নানারকম কাজ করবে, পোস্টার ব্যানার লাগাবে, প্রচার করবে, তাদেরও তো সংসার চালাতে হয়। অতএব কোনওভাবে কিছু কিছু টাকা পাইয়ে দিতেই হবে। এই বিপুল টাকার সংস্থান আসবে কোথা থেকে? অতএব দিল্লির পাঠানো টাকাই ভরসা। সুতরাং দিল্লির এজেন্ডা এখানে অনুসরণ করে বঙ্গবিজেপি। বঙ্গবিজেপি ইউপি, বিহার কিংবা অন্য হিন্দি বলয়ের স্টাইলে রাজনীতি করে এত সময় নষ্ট করেছে কেন? বাংলার রাজনীতিতে সরকার বিরোধী ইস্যু কি কম? একটা কোনও ইস্যুতে বঙ্গবিজেপি সুস্থির থেকে সরকার এবং তৃণমূলকে নাস্তানাবুদ করতে পারছে? নাকি পেরেছে? পারছে না কেন? দোষ কার? অথচ বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক বিপুল। ৩৮ শতাংশ সোজা কথা নাকি?
আবার তার সঙ্গে যোগ হয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সংসদীয় রাজনীতিতে ৪০ বছর ধরে থাকা এক অভিজ্ঞ শাসক ও নেত্রীকে চ্যালেঞ্জ করার মতো একজনও ক্যারিশমা ও জনপ্রিয়তম নেতা বিজেপি তৈরিই করতে পারছে না বাংলায়। মমতাকে হারাতে তো আরও একজন জনপ্রিয় মমতা টু দরকার! সেটা কোথায়? বঙ্গবিজেপির অসংখ্য গোষ্ঠী। তাঁরা সকলেই একটি করে স্থানিক নেতা। গোটা বাংলার নেতা অথবা নেত্রী বলে কেউ নেই বিরোধীদের কাছে।
নেতাদের মধ্যে যেমন নানাবিধ গোষ্ঠী আছে, তেমনই আবার বিজেপি কর্মী এবং সমর্থকদের মধ্যেও রয়েছে একাধিক গোষ্ঠী। কোনও গোষ্ঠী পুরনো বিজেপি পন্থী। তারা আর নতুন বিজেপির নেতৃত্বের কাছে গুরুত্ব পায় না। তারা মনে করে তৃণমূল অথবা সিপিএম থেকে আসা সুবিধাবাদী শ্রেণির যে বিজেপি, তারা আসল বিজেপির নীতি আদর্শকে ধ্বংস করছে। আবার আর একটি গোষ্ঠী আছে, যারা মনে করে দিল্লি থেকে আসা বিপুল অর্থের ভাগাভাগি হয়ে যাচ্ছে কিছু কিছু উচ্চপর্যায়ের মধ্যে। আমরা কিছুই পাচ্ছি না। একদল আছে যারা মনেপ্রাণে চায় না হিন্দি বলয়ের এজেন্ডা, হিন্দি বলয়ের সংস্কৃতিকে বাংলার উপর চাপিয়ে দেওয়া হোক। তারা অপছন্দ করে যে, বিহার ও ঝাড়খণ্ড থেকে বহিরাগতদের আমদানি করে বাংলার বহু স্থানে রাজনৈতিক কর্মসূচি করা হোক। আবার কেউ কেউ ক্ষুব্ধ যে, এত উগ্র মুসলিম বিদ্বেষ কী দরকার? এতে তো ক্ষতিই হচ্ছে? কারণ তাদের অভিমত হল, বিজেপি যত বেশি মুসলিম বিদ্বেষী প্রচার করবে, ততই আরও বেশি করে বাংলার মুসলিম একজোট হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই ভোট দেবে। অথচ মুসলিমদের মধ্যেও বিরাট অংশ তৃণমূল বিরোধী। তাদের তৃণমূল বিরোধী ভোটার থেকে তৃণমূলের পক্ষে ভোটার করে দেওয়া হবে বিজেপির মেরুকরণের। সুতরাং সেটি কি বুদ্ধিমানের রাজনীতি?
বঙ্গবিজেপি এবং কেন্দ্রীয় বিজেপির কাছে সবথেকে বড় উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত যে, কেন ভোটপ্রাপ্তির শতকরা হার ২০২৪ সালের লোকসভা এবং পরবর্তী উপনির্বাচনে কমে গেল বিজেপির? কেন ২০২৪ সালে ১৮ থেকে ১২ আসনে নেমে যেতে হল? সেই ড্যামেজ কন্ট্রোলে বঙ্গবিজেপি কি গত এক বছর তিন মাসে কিছু করেছে? আগামী কাল ভোট হলে বিজেপি নেতৃত্ব কি শপথ নিয়ে বলতে পারবে যে সরকার গড়বে তারাই? এই কনফিডেন্স কি দেখা যাচ্ছে? যাচ্ছে না। বরং কমবেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা বিজেপি ৫০ আসন পেলেও অনেক বড় সাফল্য।
এই পরিস্থিতির কারণ কী? কারণ হল, সঠিক ইস্যুতে মনোনিবেশ করতে না পারা। সরকার বিরোধী আন্দোলনে মানুষকে যুক্ত করতে না পারা। আর সর্বোপরি তৃণমূলের ভোটারের ভোটও আগামী দিনে বিজেপিতে আসতে হবে। ২০১১ সালে বামপন্থী সমর্থকদের বিপুল অংশ তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিল। অর্থাৎ চিরাচরিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোটব্যাঙ্কের বাইরে থেকে অতিরিক্ত ভোট পেয়েছিল তৃণমূল। সাধারণ অঙ্কে তাহলেই সরকার বদল সম্ভব। বিজেপি এ পর্যন্ত যত ভোট পার করেছে, তার মধ্যে শিখর স্পর্শ করা হয়ে গিয়েছে। এবার আরও বেশি আসন পেতে হলে এখন যা অবিজেপি ভোট, সেই ভোট পেতে হবে।
বর্তমান গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের আবহে বিজেপির মধ্যেই বহু নেতাকর্মী অপেক্ষা করছে সময় আসার। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল, একটানা ১২ বছর ধরে লাগাতার তৃণমূলের কাছে পরাজয় অব্যাহত থাকলে, ২০২৬ সালে বঙ্গবিজেপির অন্দরে ঝড় উঠবে। বহু ওলটপালট হবে। সবথেকে বেশি প্রমাণ হবে যে, নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহেরা শত চেষ্টা করেও একা হাতে বাংলায় ভোট জেতাতে পারেন না। ২০২৬ সালে নির্বাচনে পরাস্ত হলে প্রমাণ হবে যে, বিজেপির উত্থানের গ্রাফ নিম্নমুখী। তখন বঙ্গবিজেপির ভাঙনের পদধ্বনি স্পষ্ট হবে।
বিজেপি থেকেই ভেঙে আসবে নতুন কোনও দল! নাকি সম্পূর্ণ নতুন রূপে অন্য কোনও দলের আত্মপ্রকাশ হবে? অতীতে কখনও এসেছিল বাংলা কংগ্রেস। কখনও তৈরি হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু ১৯৯৮ সালের পর থেকে আর কোনও নতুন দল বাংলায় আসেনি। সেই সময় এসে গিয়েছে?