যত দিন যাচ্ছে, সংখ্যাটা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। একটা সময় ছিল যখন রাজনীতির ময়দানে ব্যক্তিগত কুৎসা হয়ে উঠেছিল প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার অন্যতম ‘অস্ত্র’। কার্যত রকের ভাষায় শান দিয়ে বাজার গরম করতেন রাজনীতির কারবারিরা। সেই জমানা চলে গিয়েছে, তা একেবারেই বলা যাবে না। তবে সেই ব্যক্তি-আক্রমণের পরিসর অনেকটাই দখল করে নিয়েছে ঘৃণাভাষণ। মোদি জমানায় গত এক দশকে দেশের কোণে কোণে প্রতিপক্ষকে আক্রমণের যে নতুন ভাষ্যে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে দেশবাসী, তার একক কৃতিত্ব দাবি করতে পারে বিজেপি। তাদের প্রতিপক্ষ যতটা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি, তার চেয়ে অনেক বেশি এদেশের সংখ্যালঘু, বিশেষত মুসলমান ও খ্রিস্টানরা। এদেশের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদে আস্থা রেখেছে, কিছু হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের অভিন্ন লক্ষ্যকে সামনে রেখে সংখ্যালঘু বিরোধিতাকে এক অন্য পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে আরএসএস ও তার তাঁবেদাররা। লক্ষ্যপূরণের কৌশল হিসাবে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অবিরত ঘৃণাভাষণের মাধ্যমে বিদ্বেষ বিষ ছড়ানো হচ্ছে, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা এক ছাতার তলায় আসতে পারে। মুসলমানরা ভারতের জনসংখ্যার ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। সংখ্যাটা সমস্ত সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়কে মিলিয়ে ধরলে ২০ শতাংশের আশপাশে। তার মানে, দেশের বাকি ৮০ শতাংশ মানুষ হিন্দু। তবু ‘হিন্দুরা ভয়ংকর বিপদের মধ্যে রয়েছে’, ‘সব দখল করে নিচ্ছে সংখ্যালঘুরা’—গত এক দশক ধরে এভাবেই সংখ্যালঘুদের ‘শত্রু’ বানিয়ে বিদ্বেষ, বিভাজনের চাষ করে চলেছে গেরুয়াবাহিনী। দিল্লির মসনদ তো বটেই, বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা ভোটেও এই বিদ্বেষ বিভাজনের প্রচারই মোদিবাহিনী তুরুপের তাস হিসাবে ব্যবহার করে চলেছে।
ঘৃণাভাষণ ছড়িয়ে বিভাজন তৈরি করতে আরএসএস তথা বিজেপি কতটা মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে—তার একটা ঝলক পাওয়া যাবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। স্বনামধন্য সংস্থা ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’-এর ২০২৫-এর প্রতিবেদন বলছে, গত বছর গোটা দেশে অন্তত ১৩১৮টি ঘৃণাভাষণের অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৯৮ শতাংশই মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। এই হার ২০২৩ সালের প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৪-এর তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। গত বছর ঘৃণাভাষণ বৃদ্ধির মূল কারণ পহেলগাঁওয়ের ঘটনা। সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পর এদেশের বৈধ মুসলিম নাগরিক সমাজকে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল পদ্মশিবিরের বিভিন্ন মাপের নেতাদের একাংশ। কোথাও আবার সামাজিক বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছিল। বিজেপি যে বিভাজনের বিষ ছড়ানোর কাজে বুলেট ট্রেনের গতিতে এগোচ্ছে, তার প্রমাণ ঘৃণাভাষণে বিজেপি শাসিত পাঁচ রাজ্য উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, দিল্লি ও উত্তরাখণ্ড—সবচেয়ে এগিয়ে। পরিসংখ্যান বলছে, মোট নথিভুক্ত ঘটনার ৮৮ শতাংশই ঘটেছে বিজেপি শাসিত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে। ব্যক্তিগতভাবে শীর্ষস্থানে রয়েছেন শাসক গোষ্ঠীর নেতা-মন্ত্রীদের কেউ কেউ। তালিকায় এক নম্বর উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি। দু’নম্বরে আরএসএস-এর প্রবীণ তোগারিগা, তৃতীয় বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়, চতুর্থ নীতীশ রানে। তালিকায় আছে কোনো কোনো হেভিওয়েট মন্ত্রীর নাম। একটু পিছিয়ে নবম স্থান দখল করেছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ।
‘রাজে রাজ্যে ঘৃণাভাষণ বন্ধে কড়া পদক্ষেপ করতে হবে সরকারকে। অভিযোগ দায়েরের জন্য অপেক্ষা করলে চলবে না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে ব্যবস্থা নিতে হবে পুলিশ-প্রশাসনকে।’ ২০২৩ সালের এপ্রিলে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের এমন বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণার পর কোনো রাজ্যের পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে—এমন নজির প্রায় নেই। বরং ২০২৩ থেকে ২০২৫-এ ঘৃণাভাষণের সংখ্যা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার ঘটনা যেন পরোক্ষে সর্বোচ্চ আদালতের রায়কেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে! আসলে ঘৃণার ভাষা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। বরং তা নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক সভা, ধর্মীয় সমাবেশ, মিছিল, সামাজিক অনুষ্ঠানের যেন অংশ হয়ে উঠেছে এই মোদি জমানায়। ঘৃণার ভাষাই যেন ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা—এই ঘৃণাভাষণের ভাষাতেও যেন সর্বত্র পরিকল্পনার ছাপ! ‘লাভ জিহাদ’, ‘ভূমি জিহাদ’, ‘শিক্ষা জিহাদ’, ‘ভোট জিহাদ’ ইত্যাদি। এর কোনওটারই কোনো আইনগত ভিত্তি না থাকলেও বারবার এইসব শব্দবন্ধ ব্যবহার করে মিথ্যাকে ‘সত্য’ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সেইসঙ্গেই চলছে সরাসরি হিংসার আহ্বান। কোথাও কোথাও মাদ্রাসা ভাঙা, হাতে অস্ত্র তুলে নাও-এর মতো হুমকিও চলছে প্রকাশ্যে। উদ্বেগের বিষয় হল, এসব প্রকাশ্যে চললেও রাষ্ট্রনেতারা নীরব! বরং প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব, উদাসীনতার মধ্যে যেন একটা ‘বেশ হচ্ছে’ জাতীয় মনোভাব। সন্দেহ নেই, গণতন্ত্রের জন্য এ এক বড় অশনি সংকেত। দেশবাসীর জন্যও চরম সতর্কবার্তা।