প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্ৰাম: আত্মনির্ভরতায় রয়েছেন, কিন্তু আত্মপ্রচারে নেই—তিনি ডঃ শান্তনু ভৌমিক। ঝাড়গ্রামের এই কৃতি সন্তানের তৈরি তাঁবু এখন ‘বরফের দেশ’ সিয়াচেনের ‘গরমঘর’। শুধু প্রতিপক্ষ পাকিস্তান নয়, রক্ত জমাট করা ঠান্ডার মতো প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে মাথা গোঁজার সেই তাঁবু এখন বড় ভরসা সেনাবাহিনীর।
ঝাড়গ্রাম শহরের কদম কাননে শান্তনুবাবুর ছোট্ট বাড়ি। জীবনযাপনও সাদামাটা। খড়্গপুরের সাউথ-ইস্টার্ন রেলওয়ে বয়েজ হাই স্কুলের এই প্রাক্তনী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পরম ভক্ত। বর্তমানে তামিলনাড়ুর অমৃত বিশ্ব বিদ্যাপীঠমের অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক নিরলস কাজ করে চলেছেন ভারতের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে। দেশীয় প্রযুক্তিতে বানিয়েছেন বুলেট প্রুফ বর্ম। উৎসর্গ করেছেন নেতাজির নামে। সিয়াচেনে প্রবল ঠান্ডা ও শত্রুপক্ষের সঙ্গে লড়াইয়ে সেনাদের শক্তি জোগাতে আবিষ্কার করেছেন তাঁবু। সেটিও সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে। আর তা উৎসর্গ করেছেন রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের নামে, ‘লক্ষ্মীবাঈ আর্মার’। শান্তনুবাবু মনেপ্রাণে চান, আত্মনির্ভরতার পথ ধরে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্র হয়ে উঠুক তাঁর প্রিয় ভারতবর্ষ। তাঁর সবক’টি সৃষ্টি উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে ভারতের প্রতিরক্ষা মহলে। শান্তনুবাবুর কাজের প্রশংসা করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালও।
সিয়াচেন বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুর্গম এক হিমবাহের ছবি। পৃথিবীর উচ্চতম যুদ্ধক্ষেত্র। যেখানে ঋতুর তারতম্য বলে কিছু নেই। বছরের প্রায় সবদিনই তাপমাত্রা মাইনাস ৫০ ডিগ্রি। চারিদিকে শুধু বরফ আর বরফ। তার মধ্যেই ভারতীয় সেনার নর্দার্ন কমান্ডের ১৫০টি ছাউনি। গত চার দশকে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে প্রাণ হারিয়েছেন দু’হাজারেরও বেশি সেনা। কারও মৃত্যু প্রবল ঠান্ডার কারণে, কারও আবার তাঁবুতে আগুন লেগে। একটু গরমের জন্য তাঁবুতে বুখারা বা স্টোভ জ্বেলে রাখতেন অনেক জওয়ান। মুহূর্তের অসাবধানতায় সেই স্টোভ থেকে ঘটে যেত অগ্নিকাণ্ড। শান্তনুবাবুর অবদানে সেনাদের সেই কষ্ট এখন অনেকটাই লাঘব হয়েছে। কমেছে মৃত্যুর হার। হিমালয় রেঞ্জে বিস্তীর্ণ ভারতীয় সীমান্তে সেনাদের বড় ভরসা ‘লক্ষ্মীবাঈ আর্মার’। সেই ২০২২ সাল থেকে।
ছুটি-অবসরে কয়েকদিনের জন্য ঝাড়গ্রামে আসেন শান্তনুবাবু। গত সোমবার বাড়িতে ঘরোয়া আড্ডায় তাঁবু আবিষ্কারের নেপথ্য কাহিনি শোনাচ্ছিলেন—‘২০২১ সালে নর্দার্ন কমান্ডের মেজর নন্দা ফোন করেছিলেন। সামান্য দু’একটা কথার পরই তিনি জানতে চান, মাইনাস ৫০ ডিগ্ৰির তাপমাত্রার হাত থেকে সেনাদের রক্ষা করার মতো কোনও টেন্ট তৈরি সম্ভব কি না। যেটা আবার আগুনেও পুড়বে না। আমি আশ্বাস দিয়ে কাজ শুরু করি। গবেষণাগারে একাধিক পরীক্ষার পর পলিইথারইথারকিটোন, পলিবেঞ্জিমিডাজোল, সিলিকন ফোম দিয়ে প্যানেল তৈরি করা হয়। সেগুলি জুড়ে জুড়ে টেন্টটি তৈরি করা হয়। ওই বছরই ১৫, ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর সিয়াচেনে তাঁবুটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। সাফল্য মিলতেই উৎসবে মেতে ওঠেন জওয়ানরা। কেক কেটে আমার ৫৩ জন্মদিন পালন করেন। দিনটি কোনওদিন ভুলব না।’ মন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা বলছিলেন, ‘শান্তনুবাবু আমাদের জেলার গর্ব। ওঁর ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত গবেষণামূলক কাজ জেলায় ব্যবহার করা যায় কি না, সেটা দেখা হচ্ছে।’