পি চিদম্বরম: সংসদে পাশ করা কোনও আইনের একটি বিধান যখন সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্ট বাতিল করে, তখন সেটি অন্তত সরকার এবং সাংসদদের খোঁচা মারার শামিল। বিলের বিধানগুলি সংবিধানের বিধান লঙ্ঘন করছে এই যুক্তিতে যখন কোনও বিলের বিরোধিতা করা হয়, তা সত্ত্বেও সরকার সংসদে বিলটি পাশ করে এবং অবশেষে সেটি বাতিলও হয়ে যায়, তখন ব্যাপারটি সরকারের মুখের উপর একটি চপেটাঘাতের চেয়ে কম কিছু নয়। আরও খারাপ পরিস্থিতি বিবেচনা করুন: বিলটি সংসদে উত্থাপন করার পর বিরোধিতা করা হয়। তখন সেটি পাঠানো হয় যৌথ সংসদীয় কমিটিতে (জেপিসি)। এদিকে, জেপিসির বেশ কয়েকজন সদস্য বিলটি সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করে একটি নোট (ডিসেন্ট নোট) লেখেন। অন্যান্য কারণ উত্থাপন করার পাশাপাশি তাঁরা এই যুক্তিও দেন যে, এই ধরনের বিল পাশ করার যোগ্য জায়গা সংসদ নয়। তবুও সরকার সমস্ত আপত্তি উপেক্ষা করে বিলটি পাশ করে। পরবর্তীকালে আইনের বিধানগুলি আদালত বাতিল কিংবা স্থগিত ঘোষণা করে দেয়। সরকারের পক্ষে এটি চরম অবমাননা এবং তার প্রতিফলন পড়েছে আইন মন্ত্রকের উপর।
সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়
এটাই হল ওয়াকফ (সংশোধন) আইন, ২০২৫-এর কাহিনি। গত ১৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট আইনের মূল ধারাগুলি স্থগিত করে দিয়েছে। তবুও সরকার সাহসী ভূমিকা নিয়ে নিজেকে অভিনন্দিত করেছে নিজেই। সরকার দাবি করেছে যে, মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘সংস্কার’ করার তাদের প্রচেষ্টাকে আদালত সমর্থন করেছে।
পাঠক, ইতিপূর্বে প্রকাশিত (৭ এপ্রিল, ২০২৫/ বর্তমান) আমার একটি বিশেষ নিবন্ধে (‘মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ’ শীর্ষক) আর একবার চোখ বুলাতে বলব। আমি সংসদে উত্থাপিত বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উল্লেখ করেছিলাম তাতে। কেবল বিলের ধারাগুলি নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের একগুঁয়েমি ছাড়া সরকারের কাছ থেকে কোনও উত্তরই মেলেনি। সৌভাগ্যক্রমে, আমাদের প্রশ্নের অন্তর্বর্তীকালীন উত্তর দিয়েছে স্বয়ং সুপ্রিম কোর্ট:
১. আইনের অধীনে, ওয়াকফ তৈরি করছেন যে ব্যক্তি তাঁকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে তিনি কমপক্ষে পাঁচবছর ধরে ইসলাম ধর্ম পালন করছেন। আমরা জিজ্ঞাসা করেছি যে একজন ব্যক্তি কীভাবে ‘প্রদর্শন’ করেন যে তিনি ইসলাম পালন করছেন? সুপ্রিম কোর্ট ৩ নম্বর সেকশনের অধীনে ক্লজ (আর)-এর একটি অংশ স্থগিত করেছে। কোনও ব্যক্তি কমপক্ষে পাঁচবছর ধরে ইসলাম ধর্ম পালন করছেন কি না তা নির্ধারণের জন্য যতক্ষণ না রাজ্য সরকারগুলি একটি ব্যবস্থা প্রদানের রুল বা নিয়ম তৈরি করছে, এই আদেশ ততক্ষণ বহাল থাকবে। (অন্যকোনও ধর্মের ব্যক্তিগত আইনে অনুরূপ কোনও বিধান নেই।)
২. ওয়াকফের জন্য উৎসর্গীকৃত সম্পত্তি ‘সরকারি’ সম্পত্তি হিসেবে দাবি করা হলে সেই প্রশ্নের
মীমাংসা করে দেবেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। ব্যাপারটি যতক্ষণ না তিনি নির্ধারণ করে দিচ্ছেন সম্পত্তিটি ততক্ষণ পর্যন্ত ওয়াকফ সম্পত্তি বলে গণ্য হবে না। এবং সম্পত্তিটিকে যদি তিনি ‘সরকারি’ সম্পত্তি হিসেবে নির্ধারণ করেন তবে রাজস্ব রেকর্ডে তার জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনও করে দেবেন। আমরা জিজ্ঞাসা করেছি যে, এটি সরকারের নিজস্ব মামলায় তার নিজ প্রয়োজনে বিচারক হওয়ার শামিল হয়ে যাবে না কি? সুপ্রিম কোর্ট ৩সি ধারার—উপধারা (২), উপধারা (৩) এবং উপধারা (৪)-এর শর্তাবলি স্থগিত করে দিয়েছে।
৩. রাজস্ব রেকর্ড ‘সংশোধন’ হয়ে গেলে, ওয়াকফ সম্পত্তির উপর তার স্বত্ব হারাবে। আমরা জিজ্ঞাসা করেছি যে, এটি কি ‘এগজিকিউটিভ অ্যাকশনের’ মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তি দখল (আসলে, বাজেয়াপ্ত) করার সমতুল্য হয়ে যাবে না? সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, যতক্ষণ না বিষয়টি একটি বিচারবিভাগীয় অ্যাপিলেট ট্রাইবিউনাল এবং সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট থেকে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না-হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রেকর্ড সংশোধন করা হবে না এবং সেটিকে বাজেয়াপ্তও করা হবে না—ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে। সংগতভাবেই ওই সম্পত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে না কোনও তৃতীয় পক্ষের অধিকার।
৪. সংশোধনী আইনে এমন বিধানও করা হয়েছে যে, রাজ্য ওয়াকফ বোর্ড এবং কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলে অমুসলিমদের, এমনকি চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার (সিইও) হিসেবেও নিয়োগ করা যেতে পারে। আমার মতে এটা বদমায়েশি করেই করা হয়েছে। আমরা জিজ্ঞাসা করেছি যে, অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী আইনগুলিতে কি একইরকম বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হবে? হিন্দু ধর্মীয় এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানে মুসলিম কিংবা খ্রিস্টান ব্যক্তিদেরও নিয়োগ করা হবে কি? আপত্তিকর বিধানগুলির সবটা অবশ্য শীর্ষ আদালত স্থগিত করেনি। বরং অন্তর্বর্তীকালীন আদেশকে সীমিত করেছে। যেমন, বলা হয়েছে—কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলের ২২ সদস্যের মধ্যে চারজনের বেশি অমুসলিম রাখা যাবে না। এছাড়া স্টেট ওয়াকফ বোর্ডের ১১ সদস্যের মধ্যে অমুসলিম তিনজনের বেশি থাকতে পারবেন না। সর্বোপরি বলা হয়েছে যে, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও হিসেবে একজন মুসলিম ব্যক্তিকেই নিয়োগের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো উচিত।
বিনয়ের ভান মাত্র
ওয়াকফ (সংশোধন) আইন সম্পূর্ণত অথবা অন্তত মূল ধারাগুলির অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশের জন্য গৃহীত আবেদনের উপর সুপ্রিম কোর্ট সওয়াল-জবাব শুনেছে তিনদিন ধরে। একটি স্থগিতাদেশের আর্জি শোনার জন্য আদালত তিনদিন সময় দিয়েছে, ব্যাপারটি ছিল অস্বাভাবিক। চূড়ান্ত সওয়াল-জবাবের জন্য মামলাটি তালিকাভুক্ত হলে আরও বক্তব্য কোর্ট শুনবে। চরিত্র অনুযায়ী এই সরকার ক্ষতগুলিকে সারাতে যত্নবান হবে এবং তার হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা মেনে সংখ্যালঘুদের উপর আরও আক্রমণের ছক কষবে।
ওয়াকফ (সংশোধন) আইনের মুখে বিদ্বেষের কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদটি সরকার সতর্কভাবে পালন করলে—
‘প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায় বা এর যে-কোনো অংশের অধিকার থাকবে—
(ক) ধর্মীয় ও দাতব্য উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করার;
(খ) ধর্মীয় নিজস্ব বিষয়গুলি পরিচালনা করার;
(গ) ...; এবং
(ঘ) ...
দেশের বহুজাতিক এবং বহুধর্মীয় (মালটি এথনিক অ্যান্ড মালটি রিলিজিয়াস) চরিত্র সংরক্ষণ এবং সুরক্ষায় সত্যিকার অর্থে আগ্রহী যে-কোনো ব্যক্তির ওয়াকফ (সংশোধন) আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত—বিশেষ করে হিন্দুদের।
ভারত ছোটো হয়ে গিয়েছে
২০২৫ সালের সেরা অনুমান অনুসারে, ভারতের জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ ২০ কোটি ২০ লক্ষ এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ ৩ কোটি ২০ লক্ষ। হিন্দু সবচেয়ে প্রাচীন ধর্ম হলেও খ্রিস্ট এবং ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের সংখ্যা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। বিশ্বাস করতে পারি যে, আমরা ধর্মনিরপেক্ষ এবং সহনশীল। কিন্তু ভারতকে সারা বিশ্ব দেখবে আমাদের দেশের আইন, সরকারি পদক্ষেপ এবং জনগণের সামাজিক আচরণের প্রিজমের ভিতর দিয়ে। ওয়াকফ (সংশোধন) আইন পাশ হওয়ার ফলে বিশ্বের চোখে ভারত ছোটোই হয়ে গিয়েছে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত