Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

খাদ্যের অধিকার ও দুষ্টচক্র

মানুষের বাঁচার জন্য ন্যূনতম রসদ তিনটি—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান। অর্থাৎ প্রথম প্রয়োজন হল খাদ্য। খাদ্য সংগ্রহের জন্য প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ লড়াই করছে।

খাদ্যের অধিকার ও দুষ্টচক্র
  • ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মানুষের বাঁচার জন্য ন্যূনতম রসদ তিনটি—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান। অর্থাৎ প্রথম প্রয়োজন হল খাদ্য। খাদ্য সংগ্রহের জন্য প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ লড়াই করছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মানুষের খাদ্যের অধিকার সুনিশ্চিত করার নিদান দিয়েছে। তারপরও অনাহার, মন্বন্তর সঙ্গী হয়েছে বারবার। রাষ্ট্রসংঘ ঘোষণা দেওয়ার পরেও, খাদ্যের অধিকারকে আইনি প্রতিষ্ঠা দিতে স্বাধীন ভারতের দীর্ঘদিন কেটে গিয়েছে। তাই খাদ্যের অধিকার কতটা মূল্যবান তার ব্যাখ্যা আজ নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু সেই অধিকারের উপর হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে মোদি জমানার তৃতীয় পর্বে। চাল-গমের পরিবর্তে রেশন গ্রাহকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি খাদ্যশস্যের দাম হস্তান্তরের (ডিবিটি) তোড়জোড় শুরু হয়েছে। যেমনটা করা হয়ে থাকে কয়েকটি সামাজিক সুরক্ষামূলক প্রকল্প বা কর্মসূচি চালু রাখার জন্য। পিএমও থেকে খাদ্যমন্ত্রকে ফরমান গিয়েছে, রেশন খাতে ব্যয়ভার দ্রুত কমাতে হবে। সেইমতো ইতিমধ্যেই ডিবিটি চালু হয়ে গিয়েছে চণ্ডীগড়, লাক্ষাদ্বীপ, পুদুচেরি এবং মহারাষ্ট্রের একাংশে। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ওইসব এলাকায় ১১৩ কোটি টাকা ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার করাও হয়েছে।

Advertisement

এই ‘সাফল্যের ধারা’ থেকে উৎসাহিত হয়ে সরকার বাহাদুর এবার গোটা দেশকেই একইপথে আনার পদক্ষেপ করছে। অথচ ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ৮০ কোটি গরিব মানুষের মনজয়ে প্রধানমন্ত্রী বুক বাজিয়ে দাবি করেছিলেন, রেশন মারফত বিনামূল্যে খাদ্যশস্য বণ্টনের মেয়াদ আরো পাঁচবছর বৃদ্ধি করা হল। গরিব মানুষের খাদ্যের অধিকার সুরক্ষিত রাখার জন্য একমাত্র মোদি সরকার কতটা আন্তরিক ও তৎপর, সেদিন তারও ফিরিস্তি শোনাতে কার্পণ্য করেননি তিনি। মোদি বরাবর দাবি করে থাকেন, গরিবের দুঃখকষ্ট তাঁর পক্ষেই যথাযথ উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে, কেননা তিনি নিজেও উঠে এসেছেন গরিবের ঘর থেকে। কিন্তু ভোট হাতিয়ে সরকার গঠনের পরই শুরু হয়েছে তাঁর ভোলবদল। রেশন নিয়ে নানাসময়ে নানাবিধ জনবিরোধী ঘোষণা দেশবাসীর কানে এসেছে। এখন কেন্দ্রীয় সরকার এই চিন্তায় যে, রেশন দিতে গিয়ে নাকি তাদের কোষাগার খালি হয়ে যাচ্ছে। বেরিয়ে যাচ্ছে ১১ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকা! তাই গণবণ্টন ব্যবস্থার খরচ তলানিতে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে গবেষণা চলছে। এজন্য প্রথমেই করা হয়েছে গ্রাহক হ্রাসের পদক্ষেপ। গ্রাহকের হাতে আর সরাসরি খাদ্যশস্য বণ্টন নয়, তার পরিবর্তে চালু হবে ডিবিটি কিংবা গ্রাহকের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে ফুড ভাউচার, যাতে প্রকৃত লেনদেনে সরকারের নজরদারি আরো কঠোর হতে পারে। রেশন দোকানদারদের একাংশ ভুয়ো কার্ডে রেশন দিয়ে অন্যায় মুনাফা লোটে বলেও কেন্দ্রের সন্দেহ। তাই ‘ই-রুপি’ নামে ডিজিটাল কারেন্সি তৈরি করেছে এসবিআই। সেটি একেকজন গ্রাহকের নামে একমাসের মেয়াদে মোবাইলে পাঠানো হবে। সেই লেনদেন সূত্রে দিল্লিতে বসে কেন্দ্র জেনে নেবে, কে কখন কোন দোকান থেকে কত খাদ্যশস্য নিলেন? এই ব্যবস্থা একবছরের মধ্যে গোটা দেশেই চালুর জন্য খাদ্যমন্ত্রকে বিশেষ নোট তৈরি হয়েছে।

তবে এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে রেশন ডিলারদের সর্বভারতীয় সংগঠন। তাদের আশঙ্কা, এতে রেশন দোকানদারদের রুটিরুজি ধ্বংস হবে। দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে প্রায় আটদশক আগে। তবু গরিবি দূর হয়নি আজও। তবে বিভিন্ন জনমুখী সরকারি প্রকল্পের সুবাদে দারিদ্র্য অবশ্যই কিছুটা কমেছে। তাই আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি সত্ত্বেও যারা গরিবের রেশনে ভাগ বসাচ্ছে, তাদের অবশ্যই ছেঁটে দেওয়া দরকার। প্যান, আধার, ব্যাংক লেনদেন প্রভৃতি সূত্রে সেই ‘অযোগ্যদের’ খুঁজে বের করা সম্ভব। ইতিমধ্যে কিছু কার্ড চিহ্নিতও হয়েছে বলে সরকারের দাবি। বেনিয়ম ডবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলিতেই দেদার ঘটেছে বলেও খবর। এনিয়ে রাজনৈতিক তরজায় পার্টিগুলির কিছু লাভালাভ হতে পারে, তাতে আম জনতার কোনো ফায়দা নেই। সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করা গেলে আখেরে লাভবান হবে দেশ এবং স্বস্তি পাবেন করদাতারা। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, গরিবের বা ক্ষুধার্তের খাদ্যের অধিকার কেড়ে নিতে হবে! কল্যাণকামী রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হল প্রত্যেক নাগরিকের খাদ্যের অধিকার সুনিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে, খিদে পেটে ধর্মকথাও সয় না। ক্ষুধার্তের কাছে ন্যায়নীতি অবান্তর বইকি। খাদ্যের অধিকার কোনোভাবে নাকচ হলে গরিবি, স্বাস্থ্যহানি, অশিক্ষা, অপরাধ বাড়বে। এটা একটা দুষ্টচক্র। সাবধান, নতুন করে দুষ্টচক্রে আবর্তিত হওয়ার প্রহর যেন দেশে উপস্থিত না-হয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ