Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাঙালির উত্তম প্রেম

সেই কবে নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিকে ‘আত্মঘাতী’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। এতদিন বাদে উত্তমকুমারের ৯৯তম জন্মদিনে কথাটি ফের মনে পড়ল।

বাঙালির উত্তম প্রেম
  • ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী: সেই কবে নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিকে ‘আত্মঘাতী’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। এতদিন বাদে উত্তমকুমারের ৯৯তম জন্মদিনে কথাটি ফের মনে পড়ল। কারণ, অনেক খুঁজেপেতেও এমন দৃষ্টান্ত খুব বেশি নজরে এল না, যাতে বলা যেতে পারে যে বাঙালি তার অন্যতম ‘আইকন’-এর স্মৃতিরক্ষায় কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ করেছে। ব্যতিক্রম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনের নামকরণ ও মহানায়কের নামে পুরস্কার চালু করা। এছাড়াও বর্তমান রাজ্য সরকার আরও একটি কাজ করেছে যেটি সেভাবে প্রচারিত নয়, তা হল উত্তমকুমার অভিনীত সাতটি ছবি ডিজিটালি রেস্টোর করার জন্য পুনেতে পাঠানো। কিন্তু এর বাইরে? তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে কিছুই হয়নি, কিচ্ছু না। যে মানুষটি দুশোরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন, তাঁর মাত্র সাতটি ছবি রেস্টোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাও আবার তাঁর মৃত্যুর প্রায় ৪৫ বছর পর! এটা মহাসমুদ্র থেকে এক ঘটি জল তোলার শামিল। এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, উত্তমকুমারের ছবি সংরক্ষণ করে হবেটা কী? এর উত্তর হল, বাংলা সিনেমার ইতিহাস সংরক্ষিত হবে। যা না করা আত্মহত্যার শামিল। কারণ, উত্তমকুমার বাংলা সিনেমায় একটা যুগের সূচনা করেছিলেন। কোনও শিল্পরসিক গবেষক যদি বাংলা সিনেমা নিয়ে গবেষণা করতে চান, তবে এগুলো হবে তাঁর অন্যতম উপাদান। সত্যজিৎ রায়ের মতে, উত্তমকুমার হলেন প্রথম বাঙালি হিরো যিনি ফিল্মে অভিনয়ের মোড় ঘুরিয়েছিলেন। তাঁর আগে পর্যন্ত বাংলা ছবির হিরোদের অভিনয়ে যে অতিনাটকীয়তা দেখা যেত, উত্তমকুমারই প্রথম তা পরিহার করে স্বাভাবিক অভিনয় শুরু করেন। শম্ভু মিত্রও একই মত পোষণ করেছিলেন নরেশ মিত্রের ‘বউ ঠাকুরাণীর হাট’ ছবিতে উত্তমের সহশিল্পী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে। সেই ‘বউ ঠাকুরাণীর হাট’ ছবিটি কি আজ কোনও শিল্পরসিক বা গবেষক চাইলেই দেখতে পাবেন? হ্যাঁ পাবেন, ইউটিউবে ছবিটির একটি ভার্সন আপলোড করা আছে। কিন্তু তার ছবি অস্পষ্ট, সাউন্ড কোয়ালিটিও খারাপ। একটানা ছবিটি দেখা মুশকিল। ঠিক এই কারণেই ছবিগুলি রেস্টোর করা প্রয়োজন। ছবিগুলি ডিজিটালি রিমাস্টার করলে তা ফের ঝকঝকে হয়ে উঠবে। সংলাপ পরিষ্কার শোনা যাবে। কিন্তু এ ছবি তো রেস্টোর করতে পাঠানো সাতটি ছবির মধ্যে নেই। এরকমই আরও বহু ছবি যেগুলি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, সেসব ছবিও নেই। আসলে উদ্যোগ নিতেই অনেক সময় চলে গিয়েছে। উচিত ছিল উত্তমকুমার মারা যাওয়ার পরই এই উদ্যোগ নেওয়া। কিন্তু তখন রাজ্যে ক্ষমতাসীন বাম সরকার উত্তমকুমার সম্পর্কে এতটাই উদাসীন ছিল যে, তাঁর ছবির সংরক্ষণ করা দূরে থাকুক, মৃত্যুর পর রবীন্দ্রসদনে তাঁর মরদেহ রাখতেও অস্বীকার করেছিল। কিছু স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী তো উত্তমকুমারকে শিল্পী বলে স্বীকারই করতে চান না। সত্যজিৎ রায় এই ধরনের ‘হাই ব্রাও’, ‘উন্নাসিক’ বুদ্ধিজীবীদের সরাসরি ‘বোকা’ বলে অভিহীত করেছিলেন। উত্তমকুমারের স্মরণসভায় তিনি বলেছিলেন, স্টার সম্পর্কে এদের ধারণা খুবই অস্পষ্ট। জনপ্রিয় হিরো মানেই যে তিনি অভিনেতা পদবাচ্য নন, এ ভাবনা ভুল। মার্লন ব্র্যান্ডোর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ব্র্যান্ডো প্রথম ছবিতেই স্টারের তকমা পেয়েছিলেন, পাশাপাশি তাঁর অভিনয়ও ছিল অনেক উঁচুদরের। উত্তমকুমারের অভিনয় দক্ষতা নিয়েও তিনি উচ্ছ্বসিত ছিলেন। ‘নায়ক’ ছবিতে উত্তমকুমারের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ছবিটিতে আমি নিজের অনেক ত্রুটি খুঁজে পেয়েছি, কিন্তু উত্তমের প্রায় কোনও ত্রুটিই আমার চোখে পড়েনি। উত্তমকুমার সম্পর্কে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালকের এই মূল্যায়নের পরও কিন্তু বাম সরকারের মধ্যে কোনও হেলদোল দেখা যায়নি। তারা কি পারত না উত্তমকুমারের ফিল্মগুলিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে? অনায়াসেই পারত। মনে রাখতে হবে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ফিল্ম প্রযোজনাতেও নেমেছিল। বহু পরিচালককে রাজ্য সরকার ছবি বানাতে টাকা দিয়েছিল। কাজেই ছবি সংরক্ষণ করাটা মোটেই সমস্যার হতো না। আসলে বাম সরকার উত্তমকুমারকে দেখেছিল চোখে সঙ্কীর্ণ রাজনীতির চশমা পরে। অভিনয় শিল্প সম্পর্কে তাদের কোনও স্বচ্ছ ধারণাই ছিল না। তখনই যদি উত্তমকুমারের ছবিগুলি সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হতো তাহলে এখন অনেক ছবিই রেস্টোর করার যোগ্য থাকত। কিন্তু দীর্ঘ অবহেলায়, অযত্নে বহু মূল্যবান ছবি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মালিকানার জটে বহু ছবি স্রেফ হারিয়ে গিয়েছে। ফলে এখন সদিচ্ছা দেখালেও সেসব ছবি উদ্ধার করা যাবে না। কিন্তু 

Advertisement

নয় নয় করেও এখনও কিছু ছবি অবশিষ্ট রয়েছে। যেগুলি রেস্টোর করা যেতে পারে। 
বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থা, পরিবেশক ও চ্যানেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, উত্তমকুমার অভিনীত শ’ দুয়েক ছবির মধ্যে এখনও গোটা পঞ্চাশেক ছবিকে ফোর কে রেজ্যুলিউশনে ডিজিটালি রিমাস্টার করা সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হল, উদ্যোগ নেবে কারা? এ দায়িত্ব কি শুধুই সরকারের, কর্পোরেট সংস্থাগুলি এগিয়ে আসতে পারে না? আমাদের রাজ্যে বহু বাঙালি শিল্পপতি, উদ্যোগপতি আছেন। নিজের ভাষা, নিজের সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে তাঁরা এগিয়ে আসতে পারেন না? এ তো শিল্প সংস্থাগুলির সামাজিক কর্তব্যের অঙ্গ। বহু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা বছরভর নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে, তারাও তো এগিয়ে আসতে পারে। ভারত সরকারের তৈরি স্বশাসিত একটি সংস্থা আছে— ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া। এই সংস্থার নানা কর্মসূচির মধ্যে একটি হল ফিল্ম প্রিজার্ভেশন। তারা কি পারে না মহানায়কের এখনও যে ক’টি ছবি বেঁচেবর্তে রয়েছে সেগুলির সংরক্ষণ করতে? সম্প্রতি ‘ইন্ডিয়া’জ ন্যাশনাল ফিল্ম হেরিটেজ মিশন’ প্রকল্পে গুরু দত্তের সাতটি ছবি রেস্টোর করেছে এই সংস্থা। গুরু দত্তের শতবর্ষ উপলক্ষে সেগুলি বিভিন্ন মাল্টিপ্লেক্সে দেখানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। উত্তমকুমারেরও শতবর্ষ আসন্ন। সেই উপলক্ষে এরকম উদ্যোগ নেওয়া যায় না কি? তবে এ জন্য রাজ্য সরকারকে অথবা কোনও না কোনও কর্পোরেট সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। যেমন গুরু দত্তের ছবিগুলির ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে ‘আল্ট্রা মিডিয়া অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট’ নামের প্রযোজনা সংস্থাটি। যেমন সত্যজিৎ রায়ের ছবিগুলির রেস্টোরেশনে উদ্যোগী হয়েছিল রে সোসাইটি, দ্য ক্রাইটেরিয়ন কালেকশন, আরডি এন্টারটেইনমেন্ট অ্যান্ড পিক্সিয়ন স্টুডিওস, ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন অ্যান্ড দ্য ফিল্ম ফাউন্ডেশন’স ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ প্রজেক্ট প্রমুখ সংস্থা। 
কোনও কর্পোরেট কিংবা ফিল্ম প্রযোজনা সংস্থার অংশগ্রহণ এই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজন। কারণ, আমাদের দেশে একেকটি ছবি রেস্টোর করে তাকে ফোর কে রেজ্যুলিউশনে ডিজিটাইজ করতে প্রায় সাড়ে সাতাশ লক্ষ টাকা (এনএফডিসি-র রেট) প্রয়োজন। এই টাকাটা যে কোনও কর্পোরেট সংস্থার পক্ষে খরচ করা কোনও ব্যাপারই না। কিন্তু সে উদ্যোগ কে নেবে? তবে যা জানা গেল, তাতে বিদেশে রেস্টোর করা গেলে আরও ভালো ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু তাতে খরচও বেশি। উত্তমকুমারের প্রতিষ্ঠিত ‘শিল্পী সংসদ’ এখনও সচল। কিন্তু এ নিয়ে তাদের মধ্যেও উদ্যোগহীনতা রয়েছে। যেসব প্রযোজক সংস্থার কাছে উত্তমকুমারের ছবি আছে তাদেরও অনেকে উদাসীন। কয়েকটি কর্পোরেট ও সাংস্কৃতিক সংস্থাকে নিয়ে কনসোর্টিয়াম গড়ে কাজটি করা অসম্ভব নয়। কিন্তু কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভাঙাতে যত ঢাকঢোল, কাঁসর-ঘণ্টা বাজানোর প্রয়োজন সেটা বাজাবে কে? 
এছাড়া উত্তমকুমারের ব্যবহার্য জিনিসপত্র, প্রপস, পোশাক নিয়ে একটি স্থায়ী প্রদর্শশালা গড়ে তোলা যেতে পারে। চলচ্চিত্র শতবর্ষ ভবনে সেরকম একটি উদ্যোগ হয়েছে বটে, কিন্তু তার ব্যাপ্তি ততটা নয়। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের কথা, মৃত্যুর ৪৫ বছর বাদেও উত্তমকুমারকে নিয়ে একটিও তথ্যচিত্র কেউ বানিয়ে উঠতে পারলেন না! দু’-একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বটে, কিন্তু সেগুলি শেষপর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। অথচ আমাদের দেশেই মুম্বইয়ের দিকে যদি চোখ ফেরাই সেখানে কিন্তু অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খানদের নিয়ে একাধিক কাজ হয়েছে। বহু বই তাঁদের উপর লেখা হয়েছে। উত্তমকুমারকে নিয়েও বাংলায় অনেকগুলি বই আছে, কিন্তু তার মধ্যে গবেষণাধর্মী কাজ সেরকম নেই। অথচ অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে পিএইচডি পর্যন্ত করেছেন একজন। তিনি আবার বাঙালি। সুস্মিতা দাশগুপ্ত নামে সেই গবেষক জওহরলাল নেহরু বিশ্বদ্যিালয় থেকে অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে পিএইচডি করেছেন। আজকাল তো বায়োপিকের রমরমা। ধোনি থেকে সৌরভ, সবার বায়োপিক হচ্ছে। অথচ উত্তমকুমারের মতো বর্ণময় চরিত্রকে নিয়ে কেউ বায়োপিক করার কথা ভাবলেন না! এই আমরাই প্রতিবছর ২৪ এপ্রিল অথবা ৩ সেপ্টেম্বর এলে পত্র-পত্রিকায়, ফেসবুকে ইনিয়ে বিনিয়ে মহানায়কের স্তুতি গাই, নস্টালজিয়া উগরে দিই। কিন্তু একবারও ভেবে দেখি না, একজন শিল্পী মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে, নিছক স্তুতির মধ্যে নয়। তাই শিল্পীর কাজকে বাঁচিয়ে রাখাটাই তাঁকে সম্মান দেখানোর একমাত্র উপায়। কিন্তু বাঙালি সে কথা বুঝলে তো! মাঝে মধ্যে মনে হয়, বাঙালির উত্তমপ্রেম বোধহয় নিছকই হুজুগ। সাধে কি নীরদ চৌধুরী বাঙালিকে আত্মঘাতী বলেছেন। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ