


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও কৃষ্ণনগর: নদীয়ার কালীগঞ্জের মোলান্দি গ্রাম রাজ্যের অন্যান্য অশান্ত এলাকার মধ্যে একটি। ঠিক যেভাবে একদা কেশপুর, গড়বেতা, খানাকুলের নাম খবরের শিরোনামে থাকত। পালাবদলের পরও মোলান্দি বদলায়নি এতটুকু। রাজনৈতিক রেষারেষি লেগেই ছিল যুযুধান দু’পক্ষের মধ্যে। প্রাণ দিয়ে তারই খেসারত দিল ফুটফুটে তমান্না খাতুন। মঙ্গলবার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পায় পুলিস। সেখানে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বোমার আঘাতেই ছোট্ট তমান্নার মৃত্যু হয়েছে। তবে, দেহে স্প্লিন্টার ফুঁড়ে যাওয়ার কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ফলে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা মোটামুটি নিশ্চিত, দেশি পেটো বোমার বিস্ফোরণে মারা যায় তমান্না। বারুদের আগুনে সে প্রায় ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। পুড়ে যাওয়া অংশে সালফারের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন চিকিৎসকরা। এদিকে, সোমবার ঘটনার পরই কৃষ্ণনগর পুলিস জেলার কাছে রিপোর্ট চেয়ে পাঠায় নির্বাচন কমশন। এদিন, সেই রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে পুলিসের কাছে। সেখানেও বলা হয়েছে, পেটো বোমার বিস্ফোরণে বছর দশেকের তমান্নার মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মোলান্দি গ্রামটি সিপিএম অধ্যুষিত। বাম আমল থেকেই তৃণমূল ও সিপিএমের তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত চলে আসছে। ২০২২ সালে সেই সংঘাত চরমে পৌঁছয়। তমান্নার বাবা হোসেন শেখ এলাকায় সিপিএম কর্মী বলে পরিচিত। ওই বছর তৃণমূলের কর্মী-সমর্থককে লক্ষ্য করে বোমা সিপিএমের বাহিনী। সেই ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন হোসেন। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়। কিছুদিন পালিয়ে বেড়ানোর পর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন তিনি। পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৩ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনের ঠিক আগে গ্রামে অশান্তি রোখার আগাম চেষ্টা হিসেবে মোলান্দি গ্রামে ধরপাকড় অভিযানে নামে পুলিস। সেই সময় সিপিএমের পলাশির এরিয়া কমিটির সম্পাদক হকসেদ মণ্ডলের নেতৃত্বে পুলিসের গাড়িকে লক্ষ্য করে ব্যাপক বোমাবাজি হয়। তাতে গুরুতর জখম হন তৎকালীন কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে পুলিস। হকসেদ গ্রেপ্তার হন। অভিযুক্তদের তালিকায় ছিলেন তমান্নার বাবাও। এরপর ওড়িশায় কাজে চলে গিয়েছিলেন। তারপরও অশান্তির আঁচ ধিকধিক করে জ্বলছিল। সেই কারণেই মোলান্দি গ্রাম পুলিসের কাছে একটি স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।
কালীগঞ্জে উপনির্বাচন ঘোষণার শুরু থেকেই মোলান্দি গ্রামে সিপিএম ও তৃণমূলের মধ্যে উত্তেজনা ছড়াচ্ছিল। মাঝেমধ্যে গোলমালও লেগেছিল। সেটাই ফলাফলের দিন বড় আকার নেয় বলে পুলিস সূত্রে খবর। ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে কালীগঞ্জ বিধানসভা দখলের পর বিজয় মোলান্দিতে বিজয় মিছিল বের করে তৃণমূল। অভিযোগ, সেই মিছিল থেকেই হোসেন সহ আরও কয়েকজন সিপিএম কর্মীর বাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছোড়া হয়। সেই বোমাবাজির মধ্যে পড়ে প্রাণ হারায় তমান্না। রাজনৈতিক হিংসা, প্রতিহিংসাতেই ঝরে যায় ছোট্ট একটা তাজা প্রাণ।