


প্রীতেশ বসু, কলকাতা: খোদ বিলেত থেকে আইসিএস পাশ করে দেশে ফিরে জাতভাই নেটিভ শ্রমিকদের চাবুক মেরে কাজ করাবেন। সেটাই তো স্বাভাবিক! কিন্তু যেহেতু তিনি যুগপুরুষ, যেহেতু তিনি সুভাষচন্দ্র বসু, তিনি কি আর পাঁচজন আমলার মতো আচরণ করবেন? তিনি করেনওনি। উল্টে জাতভাই দেশবাসীদের উপর হওয়া অত্যাচারের প্রতিবাদ জানাতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন পরাধীন ভারতে। আইসিএস ত্যাগ করলেন। তৈরি করলেন অসংগঠিত শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন। ১৯৩০ সালে তাঁর সভাপতিত্বে তৈরি হল ‘ক্যালকাটা শ্রমিক মণ্ডল’। অসংগঠিত শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে সেই প্রথম একটি ইউনিয়ন গঠন হল। সর্বস্তরের শ্রমিকরা যোগ দেওয়ার অধিকার পেলেন।
এ তথ্য অনেকে জানেন বটে। তবে অনেকের অজানাও। রাজ্যের শ্রমদপ্তরে নথি সংরক্ষণের জন্য ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়া চলছে। তারপর সামনে আসছে একের পর এক অমূল্য নথিপত্র। তার মধ্যেই জ্বলজ্বল করছে সুভাষের ‘ক্যালকাটা শ্রমিক মণ্ডল’ গঠনের শংসাপত্রটি। অনেক গবেষকের বক্তব্য, পরাধীনতার গ্লানি থেকে সুভাষ আইসিএস থেকে ইস্তফা দেন। আর শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। ‘হে ভারতের শ্রমজীবী আমি তোমায় প্রণাম করি’—বিবেকান্দর লেখা এই বাণী ভীষণভাবে আলোড়িত করেছিল যুবক সুভাষের মনকে। তার ফসল, দেশের প্রান্তিক মানুষের পাশে সর্বোতভাবে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। পরে সুভাষ হয়ে ওঠেন সবার ‘নেতাজি’। হয়ে ছিলেন জননায়ক। অনেকে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীও বলেন তাঁকে। এহেন যুগপুরুষের হাতেই গঠন হয় অসংগঠিত শ্রমিকদের লড়াই চালানোর মঞ্চ।
সুভাষ একা অবশ্য নন। একাধিক বাঙালি কৃতী পুরুষ শ্রমিকদের জন্য লড়াই শুরু করেছিলেন। তাঁদের অন্যতম ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত। সম্পর্কে তিনি স্বামী বিবেকানন্দর ভাই। রাজ্যের দ্বিতীয় ট্রেড ইউনিয়নতিনি গঠন করেছিলেন সুভাষের আগে। কলকাতার সিমলা স্ট্রিটে (৩, গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিট) স্বামী বিবেকানন্দের বাড়ির ঠিকানাতেই তৈরি হয় ইউনিয়ন। সেটির দলিলে এই বাড়ির ঠিকানা উল্লেখিত। এছাড়াও সরকারি মহাফেজখানা ঘাঁটলে উঠে আসছে অমূল্য আরও কিছু নথি। দেখা যাচ্ছে, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করেছিলেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরিও। তার নাম ছিল ‘বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে ইন্ডিয়ান লেবার ইউনিয়ন’। সদর দপ্তর খড়্গপুর। এছাড়াও রয়েছে ‘ক্যালকাটা কর্পোরেশন এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন’এর নথি। রাজ্যের প্রথম ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন হয় ৩০শে জানুয়ারি ১৯২৮। সেটি হল,‘বি এন আর এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন’(বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন)। এর সভাপতি ছিলেন এন সি সেন। ট্রাস্টি ছিলেন তুলসীচরণ গোস্বামী।
এমন ১০ হাজার ‘বি রেজিস্টার’ ডিজিটাইজড করছে শ্রমদপ্তর। বর্তমানে দপ্তরের পোর্টাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এক সংস্থা থেকে অন্য একটি সংস্থার হাতে যাচ্ছে। সে কারণে সমস্ত ডিজিটাইজড তথ্য ঠিকঠাক রাখার বিষয়টি নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে বলেই মত বিভিন্ন মহলের। তবে প্রায় ১০০ বছরের পুরনো এই সমস্ত ঐতিহাসিক মূল দলিল সযত্নে সংরক্ষণ করে রাখা শ্রমদপ্তরের মহাফেজখানায়।