‘সামাজিক সুরক্ষা’ বলতে কী বোঝায়? সংক্ষেপে উত্তর হল, রাষ্ট্র ও সমাজের পক্ষ থেকে অভাব, অসুস্থতা, বার্ধক্য, পঙ্গুত্ব, বেকারত্ব ও দুর্যোগের মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্যক্তি বা পরিবারকে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়া। মূল উদ্দেশ্য হল, দারিদ্র্য হ্রাস, অসমতা দূর করা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সাহায্য করা। গালভরা প্রচার হল, ২০২৫ সালের আইএলও-র তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব সামাজিক সুরক্ষা সূচকে ভারতের স্থান দ্বিতীয়। চীনের পরেই। ২০১৫ সালে ভারতের ১৯ শতাংশ মানুষ ছিলেন সামাজিক সুরক্ষার আওতায়। মোদি ম্যাজিকে ২০২৫-তে নাকি তা ৬৪.৩ শতাংশে (প্রায় ৯৪ কোটি) পৌঁছেছে। দশ বছরে এই চমকপ্রদ ‘সাফল্য’ নাকি এসেছে ‘অটল পেনশন যোজনা’র হাত ধরে। এদেশে যত লোক শ্রমদান করেন, তার ৮৫-৯০ শতাংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রের কাজের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের কাজের জীবনে অনিশ্চয়তা যেমন বেশি, দৈনিক মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও ততটাই নগণ্য। অসংগঠিত ক্ষেত্রের এই বিপুল শ্রমশক্তির কর্মজীবনের দুর্দশা ঘোচাতে মোদি সরকার কোনও পদক্ষেপ না করলেও অবসরকালীন অবস্থায় নিরাপত্তা দিতে ২০১৫ সালে অটল পেনশন যোজনা চালু করে কেন্দ্রীয় সরকার। বলা হয়, ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত বার্ষিক সামান্য টাকা প্রিমিয়াম দিলে অবসরের পর ৬০ বছর বয়স থেকে মাসিক পেনশন মিলবে। ১০০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত মাসিক পাঁচটি ক্যাটাগরি। প্রিমিয়াম অনুযায়ী নির্ধারিত হবে পেনশন। এই প্রকল্পে ইতিমধ্যে ৮ কোটি ৬৬ লক্ষ মানুষ যুক্ত হয়েছেন বলে দাবি করেছে কেন্দ্র। কিন্তু মোদি জমানায় মানুষ সত্যিই কি পাচ্ছে সামাজিক সুরক্ষা?
গরিব মানুষকে অবসরের পর সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার নামে এই প্রকল্প আসলে কত বড়ো ভাঁওতা, তা একটু গভীরে প্রবেশ করলেই বোঝা যাবে। ধরা যাক, ২০২৬-এ একজন কর্মীর বয়স ১৮। তিনি ৬০ বছর পর্যন্ত, অর্থাৎ টানা ৪২ বছর বার্ষিক ৪২ টাকা করে প্রিমিয়াম দিলেন। তাহলে ২০৬৮ সালে ৬০ বছর বয়সের পর তিনি মাসিক ১০০০ টাকা করে পেনশন পেতে শুরু করবেন। কিন্তু তখন এই ১০০০ টাকার মূল্য কত হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের বর্তমান গড় ৫-৬ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির হার ধরলে ৪২ বছর পর আজকের ১০০০ টাকার মূল্যমান দাঁড়াবে ১০০-১২০ টাকা। যদি ৩০ বছর বয়সে কেউ প্রিমিয়াম দেওয়া শুরু করেন, তাহলে তাঁর ৬০ বছর বয়সে এই ১০০০ টাকা মাসিক পেনশনের প্রকৃত মূল্য দাঁড়াবে ১৭০-২৩০ টাকা। ঘটনা হল, অবসরের পর এমন হাতেগোনা কয়েকটা টাকা পাবেন জেনেও এই প্রকল্পে মোট নথিভুক্ত কর্মীদের মধ্যে ৮৭ শতাংশই মাসিক ১০০০ টাকা পেনশনের তালিকাতেই নাম লিখিয়েছেন। এই তথ্য বুঝিয়ে দিচ্ছে, এদেশে অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের আর্থিক ক্ষমতা এতই দৈন্য যে তাঁদের সিংহভাগ বছরে ৪২ টাকার বেশি অর্থ জমানোর অবস্থায় নেই। তার চেয়েও বড়ো প্রশ্ন হল, এখন থেকে ৩০-৪০ বছর পর মাসে কয়েকশো টাকা পেনশন একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষের ঠিক কোন সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে? এ লজ্জা, এই বাস্তব বিবেচনাবোধ দেশবাসীর থাকলেও মোদি সরকারের আছে— এমন দাবি করা যায় না। এই দৈন্যদশা কীভাবে আড়াল করবে সরকার? এবারের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা আদৌ গুরুত্ব পেল?
অথচ সামাজিক সুরক্ষা সূচকে ভারতের দু’ নম্বরে উঠে আসার পিছনে নাকি এই অটল পেনশন যোজনার অবদান প্রশ্নাতীত। এই যোজনা নাকি মোদি সরকারের অন্যতম ‘ফ্ল্যাগশিপ’ প্রকল্প। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পটিকে ‘সফল’ হিসেবে তুলে ধরতে ব্যাংক কর্মীদের ‘টার্গেট’ বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ঠিক যেভাবে বেসরকারি সংস্থায় কোনো ‘প্রোডাক্ট’ বেচার জন্য লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়। তার উপর নির্ভর করে কমিশন, অনেকক্ষেত্রে চাকরি থাকা, না থাকা। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ-এর সমীক্ষা বলছে, এই প্রকল্প থেকে আবেদনকারীদের এক-তৃতীয়াংশ নাম তুলে নিয়েছে। তাঁরা অভিযোগ করেছেন, অনুমতি ছাড়াই তাঁদের নামে অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ব্যাংকের কিছু অফিসার ‘কোটা’ পূরণের জন্য বিনা অনুমতিতে গ্রাহকের নাম প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। প্রতারণার মাধ্যমে অথবা জোর করে গছানো হচ্ছে এই প্রকল্প। অনেকক্ষেত্রে নাকি ভুল বুঝিয়ে বা গ্রাহকের অজান্তে সইসাবুদ করে নাম তোলা হচ্ছে! ঘটনা হল, এত ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েও প্রকল্পের গ্রাহক ধরে রাখা যাচ্ছে না। বরং গ্রাহক সংখ্যা কমছে। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে সরকার এই প্রকল্পে যত ‘টার্গেট’ নিয়েছিল, তার ৯০ শতাংশ পূরণ হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪-২৫-এর অর্থবর্ষে তা কমে হয়েছে ৭৪ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, এই প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট-বরাদ্দের মাত্র ২৯ শতাংশ খরচ হয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে। তবু এই ‘ধাপ্পাবাজি’ আরও অন্তত পাঁচ বছর চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই, এটা প্রচার করা যে ভারত দেশবাসীকে সামাজিক সুরক্ষা দিতে ‘সফল’।